ঢাকা | শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬,৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা হয়ে গেছেন গো-রক্ষক, হিন্দু ব্যবসায়ীরা চান গবাদিপশু জবাই

পশ্চিমবঙ্গের সোশ্যাল মিডিয়া হঠাৎ করেই গরুর ভিডিওতে সয়লাব হয়ে গেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একদল মুসলিম যুবক হিন্দু গরু বিক্রেতাদের পথরোধ করছেন এবং তাদের গরুর সাথে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারা বলছেন, “নিজের মাকে কেন বিক্রি করতে চাইছেন? তাকে বাড়ি নিয়ে সেবা করুন। আপনারা গরু বিক্রি করে টাকা কামাবেন, আর আমরা জেলে যাব।”

অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, মুসলিম যুবকরা গবাদিপশু বহনকারী ট্রাক থামিয়ে চালকদের জেরা করছেন। তারা বলছেন, “কেন আপনাদের মাকে এভাবে বেঁধে অমানবিক উপায়ে নিয়ে যাচ্ছেন? তাকে সম্মানের সাথে হাঁটিয়ে নিয়ে যান।”

একই সময়ে বেশ কয়েকজন মুসলিম ইনফ্লুয়েন্সার এবারের ঈদুল আজহায় গরু না কেনার জন্য জনগণের কাছে প্রকাশ্য আবেদন জানাচ্ছেন। এই ভিডিওগুলোর পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে আরও কিছু হৃদয়বিদারক দৃশ্য—যেখানে হিন্দু গরু খামারিরা শূন্য হাটে কোনো বেচাকেনা করতে না পেরে শুকনো মুখে উদ্বেগ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

অনেকেই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিজেপি সরকারকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন। ‘জেন জি’ নেটিজেনরা এই পরিস্থিতিকে একটি ‘উনো রিভার্স’ মুহূর্ত বলে অভিহিত করছেন—যা জনপ্রিয় একটি কার্ড গেমের রেফারেন্স, যেখানে হঠাৎ করে সব ভূমিকা উল্টে যায়।

অনলাইনে এই সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের ‘গরু সংকট’ নিয়ে করা প্রতিবেদন মাত্র এক দিনে ইউটিউবে ১০ লাখ এবং ফেসবুকে ৩০ লাখ ভিউ ছাড়িয়েছে।

যে প্রজ্ঞাপন থেকে সংকটের শুরু

গত ১৩ মে নবগঠিত বিজেপি সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণা দেয়। এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে:

১. গবাদিপশু কেবল তখনই জবাই করা যাবে যদি সরকারি সনদ থাকে যে পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি অথবা সেটি স্থায়ীভাবে কাজের অনুপযুক্ত।

২. জবাই কেবল সরকারি অনুমোদিত কসাইখানায় করা যাবে।

৩. জনসমক্ষে পশু জবাই নিষিদ্ধ।

৪. এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড, ১,০০০ রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

প্রজ্ঞাপন জারির পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং পুলিশ রাস্তায় গবাদিপশু পরিবহনকারীদের থামিয়ে হয়রানি করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত ১৬ মে হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গরুর ট্রাক থামিয়ে গরুর ‘জন্ম সনদ’ দাবি করেন—যা দ্রুত জাতীয় সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে। এর পরপরই মুসলিম সংগঠনগুলো ঈদের জন্য গরু কেনা বয়কটের প্রচারণা শুরু করে। সেই মুহূর্ত থেকেই বাংলার হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঈদের আগে খাঁ খাঁ করছে গরুর হাট

সাধারণত ঈদের আগে বাংলার গরুর হাটগুলোতে উপচেপড়া ভিড় থাকে। শত শত গরু ও মহিষ সারিবদ্ধভাবে বাঁধা থাকে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে রাতভর মুখরিত থাকে হাট। কিন্তু এ বছর অনেক হাটই ভূতুড়ে নিস্তব্ধ। গত রবিবারের এক সান্ধ্যকালীন হাটে যেখানে সাধারণত ২০০-৩০০ পশু বিক্রি হয়, সেখানে মাত্র দুটি গরু ছিল। মুসলিম ক্রেতাদের দেখা ছিল না বললেই চলে।

পরিবর্তে একদল চিন্তিত হিন্দু খামারিকে দাঁড়িয়ে ঋণ এবং টিকে থাকার লড়াই নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। ৪২ বছর বয়সী খামারি সুরজিৎ ঘোষ বলেন, “আমরা যদি বিক্রি করতে না পারি, তবে আমরা শেষ। আমাদের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে দুধের ব্যবসার ওপর টিকে আছে। গরু যখন দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, আমরা তা বিক্রি করে দিই। সাত-আট বছর পর গরু আর বাচ্চা দেয় না এবং দুধও দেয় না। এখন এই পশুগুলো নিয়ে আমরা কী করব? যদি এগুলো বিক্রি করতে না পারি, তবে আমার ১৫-১৬ লাখ টাকা লোকসান হবে। আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপে আছি।”

৩৫ বছর বয়সী বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, অনেক কৃষক চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, গয়না বন্ধক রেখেছেন অথবা জমি জমা দিয়ে পশু পালন করেছেন। “আমার একারই ১ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ আছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

২২টি গরুর মালিক ৩৩ বছর বয়সী ভাস্কর ঘোষ বলেন, “আমাদের এখন এমন পশুদের খাইয়ে যেতে হচ্ছে যারা আর কোনো আয় দিচ্ছে না। আমি এখনই ফিড এবং ওষুধ সরবরাহকারীদের কাছে ৮ লাখ টাকা ঋণী, আর আমার মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এটা চলতে থাকলে আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না।”

৬৭ বছর বয়সী গোবিন্দ ঘোষের ১৫টি গরু এবং ১৫০টি মহিষ রয়েছে। নিজের গোয়ালঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমার ২ কোটি টাকার ব্যাংক লোন আছে। এখানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করে। প্রত্যেকের বেতন ২২ হাজার টাকা এবং সাথে খাওয়ার খরচ। যদি কোনো সমাধান না হয়, তবে আমার পুরো পরিবারকে মরতে হতে পারে।”

কেন ‘১৪ বছরের নিয়ম’ কৃষকদের আতঙ্কিত করছে?

অধিকাংশ গরু ৭ থেকে ৮ বছর পর দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। একটি গরুর রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৫০০ টাকা খরচ হয়—অর্থাৎ মাসে অন্তত ৯,০০০ টাকা। একটি গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করার পর তাকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে খরচ হতে পারে ৭.৫ লাখ টাকারও বেশি।

কিন্তু একটি ১৪ বছর বয়সী গরু সাধারণত দুর্বল, রোগাক্রান্ত এবং বাণিজ্যিকভাবে মূল্যহীন হয়। কৃষকরা বলছেন, মাংসের জন্যও কেউ এমন পশু কিনবে না এবং এদের অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। দুগ্ধ খামারিদের জন্য এই নতুন নিয়মের অর্থ হলো: একবার গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করলে তা আর কখনোই বিক্রি করা যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গ নিজেই ভারতের অন্যতম বৃহত্তম গরুর মাংস উৎপাদনকারী রাজ্য, যেখানে প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন গরু এবং ১.৫ মিলিয়ন মহিষ রয়েছে। রাজ্যের সাপ্তাহিক গরুর হাটগুলো—যেমন শুনুকপাহাড়ি হাট, মায়াপুর গরুর হাট, ধোলা গরুর বাজার, বীরশিবপুর গরুহাট, বাগজোলা গরু হাট, পাংশকুড়া গরু হাট, বিহি গরু বাজার, সামসি সাপ্তাহিক হাট, গোসাইপুর হাট এবং স্বরূপনগর হাট—প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার গ্রামীণ পশুর বাণিজ্যকে সচল রাখে।

অনেক দরিদ্র কৃষি পরিবারের জন্য গবাদিপশু হলো নগদ সঞ্চয়ের মতো—একটি জরুরি বীমা ব্যবস্থা যা সংকটের সময় বিক্রি করা যায়। বর্ণ ও সামাজিক ইস্যু বিশেষজ্ঞ কুমার রানা উল্লেখ করেন যে, যদিও ঘোষ বর্ণ বাংলায় পশু পালনের সাথে সবচেয়ে বেশি যুক্ত, তবুও অনেক গ্রামীণ সম্প্রদায় গবাদিপশুর ওপরই তাদের প্রাথমিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বিজেপি নেতা অবনী মন্ডল খামারিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কথা স্বীকার করে বলেন, “এটি ১৯৫০ সালের একটি আইন যা আগের সরকারগুলো কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এখন আইনের শাসন কায়েম করছি। স্বাভাবিকভাবেই কিছু সমস্যা হচ্ছে এবং আমাদের সেগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।” খামারিদের জন্য কোনো ত্রাণ ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়নি, তবে যোগ করেন যে “দ্রুত কিছু একটা ভাবতে হবে।”

এদিকে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি লিখে আইনের ১২ নম্বর ধারার আওতায় ছাড় চেয়েছেন, যা ধর্মীয় প্রয়োজনে জবাইয়ের বিশেষ অনুমতি দেয়। চিঠিতে সিদ্দিকী সতর্ক করেছেন যে পশুচিকিৎসক সনদ এবং প্রশাসনিক বাধার কারণে দরিদ্র পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং কৃষকরা তীব্র আর্থিক সংকটের দিকে যাচ্ছে।

অনেক মুসলিম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নওশাদ সিদ্দিকীর এই হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। অনলাইনে অনেকের মন্তব্য ছিল: “এটা চলতে দিন। আমরা আর গরু খেতে চাই না, এখন তাদের বুঝতে দিন।”

সিপিআই(এম) বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানাও মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ঈদের আগে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যালকাটা হাইকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, এই আইন কার্যকর করার পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি করেছে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন।

দলটির রাজ্য কমিটির নেতা মলয় তিওয়ারি বলেন, আবেদনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের দাবি জানানো হয়েছে যাতে “একটি ঘুমন্ত এবং সেকেলে ১৯৫০ সালের আইনকে গো-রক্ষার নামে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনজীবিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা না যায়।”

একটি জনস্বার্থ মামলায় পশু ব্যবসায়ী ও দুগ্ধ খামারিদের পক্ষে আইনজীবী শামিম আহমেদ যুক্তি দেন: “রাজ্য সরকার হঠাৎ করেই পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা অবকাঠামো, সনদ প্রদান প্রক্রিয়া বা কসাইখানার সুবিধা ছাড়াই একটি ঐতিহাসিকভাবে অকার্যকর আইনকে সক্রিয় করেছে। এটি পশু ব্যবসায়ী, দুগ্ধ খামারি, পরিবহনকারী, মাংস শ্রমিক এবং চামড়া শ্রমিকদের জীবনজীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”

যদি এই নিয়ম বহাল থাকে, তবে কৃষকরা দুধের জন্য গরু পালন বন্ধ করে দেবেন, কারণ অনুৎপাদনশীল পশুদের মৃত্যু পর্যন্ত পালন করা তাদের আর্থিকভাবে দেউলিয়া করে দেবে। এর প্রভাব কেবল গরুর মাংসের অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশুখাদ্য সরবরাহকারী, পশুচিকিৎসা ওষুধ, চামড়া শিল্প, কসাইখানা, রেস্তোরাঁ, পরিবহন শ্রমিক এবং গ্রামীণ দিনমজুর—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলার মুসলিমরা—যারা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ—তারা যদি উল্লেখযোগ্যভাবে গরুর মাংস খাওয়া কমিয়ে দেয়, তবে বিকল্প প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মুরগি, খাসি এবং মাছের দামও হু হু করে বেড়ে যেতে পারে। ফলে এর প্রভাব এখন আর কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নয়; এটি হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সভ্যতার প্রশ্ন।

বাংলার ইতিহাসে এই প্রথম মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে গরু কোরবানির বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে কট্টর হিন্দু সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশ এখন হন্যে হয়ে আশা করছে যে যেভাবেই হোক, যেকোনো উপায়ে যেন গরু কোরবানি দেওয়া হয়।

সুত্র: দ্য কুইন্ট