ঢাকা | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬,১২ বৈশাখ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিশাম সম্পর্কে যা জানা গেল

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় তার রুমমেটকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর নিখোঁজ শিক্ষার্থীর হদিস এখনো মেলেনি।

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানায়, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী ২৭ বছর বয়সী জামিল লিমনের মরদেহ শুক্রবার ট্যাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয়। এদিকে নাহিদা বৃষ্টি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার এক বিবৃতিতে বলেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা, যা পুরো সম্প্রদায়কে নাড়া দিয়েছে।

এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট, ২৬ বছর বয়সী সাবেক ইউএসএফ শিক্ষার্থী হিশাম আবুঘারবিয়েহকে শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মারধর, অবৈধভাবে আটকে রাখা, প্রমাণ নষ্ট করা, মৃত্যুর তথ্য গোপন করা এবং মরদেহ সরানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

হিলসবোরো কাউন্টির চিফ ডেপুটি জোসেফ মাওরার জানান, আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তারের আগে অন্তত দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। প্রথমে তিনি সহযোগিতা করলেও বৃহস্পতিবার পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় সহযোগিতা বন্ধ করে দেন।

গ্রেপ্তারের সময় আবুঘারবিয়েহ নিজেকে একটি বাড়ির ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে সোয়াট টিম ও সংকট মধ্যস্ততাকারীদের সহায়তায় তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। তার গ্রেপ্তারের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সাঁজোয়া যান বাড়ির সামনে অবস্থান করছে এবং তিনি কোমরে তোয়ালে বেঁধে হাত তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।

তিনি তার পরিবারের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন, যেখানে পূর্বে তার ভাইয়ের করা পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত তাকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তাকে দুবার মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যদিও পরে অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এক ঘটনায় তার ভাই আদালতে অভিযোগ করেন, আবুঘারবিয়েহ তাকে ও তাদের মাকে আক্রমণ করেছিলেন। সে সময় আদালত তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যা গত মে মাসে মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে ভাই সেই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর আবেদন করলেও তা নাকচ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, আবুঘারবিয়েহ ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করেছিলেন।

জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি গত ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাদের সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল দেখা যায়। পুলিশ জানায়, সেদিন সকাল ৯টার দিকে লিমনকে তার ক্যাম্পাসসংলগ্ন বাসায় শেষবার দেখা যায়, যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় তিন ব্লক দূরে। প্রায় এক ঘণ্টা পর বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে দেখা যায়।

পরদিন এক পরিচিত বন্ধু তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশের নজরে আনেন। তদন্তকারীরা বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র অনুসরণ করছিলেন। বৃহস্পতিবার হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ নিখোঁজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

লিমনের মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি।এদিকে ময়নাতদন্তের ফল সপ্তাহান্তে প্রকাশ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম বলেন, নিখোঁজ বৃষ্টিকে খুঁজে বের করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, জামিলের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য এবং নাহিদা যেন নিরাপদভাবে ফিরে আসে— প্রার্থনা করুন।

লিমনের পরিবার সিএনএনকে জানায়, তারা ঘটনার সত্য জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার ভাই জুবায়ের আহমেদ বলেন, এটা আমাদের জন্য ভয়াবহ। কী হয়েছে, সেটাই জানতে চাই। দুইজন শিক্ষার্থী হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।

তিনি আরও জানান, লিমন তার পরিবারকে বৃষ্টির বিষয়ে বলেছিলেন এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছিল, এমনকি বিয়ের কথাও আলোচনা হয়েছিল। সে বলেছিল, মেয়েটি খুব ভালো, অনেক প্রতিভাবান—গান গায়, রান্না করতে পারে— বলেন জুবায়ের।

২০২৪ সালের ফল সেমিস্টার থেকে লিমন ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তিনি দক্ষিণ ফ্লোরিডার জলাভূমি সংকোচন পর্যবেক্ষণে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ওপর গবেষণা করছিলেন। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার ইচ্ছা ছিল তার।

অন্যদিকে বৃষ্টিও গত শরৎ সেমিস্টারে ভর্তি হয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টিকে খুঁজে পেতে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।