ঢাকা | রবিবার, ৩১ মে ২০২৬,১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার কোচিং-বাণিজ্য

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন কোচিংনির্ভর। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একাডেমিক কোচিং যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কোচিং-বাণিজ্যে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। কোচিং সেন্টারগুলোর একাধিক সংগঠন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এডুকেশন কমিউনিকেশনের জরিপ অনুযায়ী, কোচিং সেন্টারগুলোতে বছরে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

অবশ্য এডুকেশন রিসার্চ কাউন্সিল (ইআরসি) নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, দেশে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার কোচিং-বাণিজ্য হয়ে থাকে। সন্তানদের শিক্ষার জন্য এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। পাঁচ বছরে কোচিং ফি বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্লাসে একশ্রেণির শিক্ষক কোনো বিষয়বস্তুর অর্ধেক শেখাচ্ছেন। এতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী কিছুই বোঝে না। এছাড়া কোচিং না করলে নম্বর কম দেওয়া এবং ফেল করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার ঘটনাও ঘটছে। এ কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে সন্তানদের কোচিংয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা।

অতিমাত্রায় পরীক্ষা হওয়ার কারণেও কোচিংয়ে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে। রাজধানীর ৫ সহস্রাধিক কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন নামিদামি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। শুধু একাডেমিক নয়, সব পরীক্ষাতেই কোচিং করছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তিতে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। এসব কোচিংয়ের মুখরোচক বিজ্ঞাপনে ভরে গেছে রাজধানী। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ও আবেগকে পুঁজি করে ইচ্ছেমতো গলাকাটা হারে ভর্তি ফি আদায় করছে কোচিং সিন্ডিকেট। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিক্যাল ভর্তি-সহায়ক বইয়ের বাজার প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্ধেক বই বিক্রি করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার।

দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। তবে নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টার ২ লক্ষাধিক। রাজধানীর পাশাপাশি প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে স্কুল-কলেজের আশপাশে দেখা মিলছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের। এসব কোচিং সেন্টার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট হলেও নিবন্ধন বা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সিটি করপোরেশ, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো তদারকি নেই বললেই চলে। এদিকে কোচিং সেন্টারগুলোকে ‘ছায়াশিক্ষা’ হিসেবে স্বীকৃতির দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার একশ্রেণির শিক্ষক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। হাইকোর্টের আদেশে ২০১৯ সালে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ১০ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন। ঐ শিক্ষার্থীদের নাম, রোল ও শ্রেণি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানাতে হবে। এ নীতিমালা ঢাকাসহ দেশের কোথাও মানা হচ্ছে না। নীতিমালা শুধু কাগজ-কলমে আছে। কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে তদারকি করতে মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় এলাকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের কমিটি থাকার কথা। জেলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে আট সদস্যের কমিটি গঠনের কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে। বাস্তবে এসব কমিটির কার্যকারিতা দেখা যায় না। ক্লাসে পড়া না পারা বা হোমওয়ার্ক না করাসহ নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ডিটেনশনে পাঠানোর নামে ছুটি শেষে ১৫ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলে কোচিং না করা শিক্ষার্থীদের ওপরে এভাবে চলছে ডিটেনশন নামক নির্যাতন। শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে কোচিং সেন্টারগুলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। বহু ক্ষেত্রেই মানহীন শিক্ষকরা সেখানে পাঠদান করছেন। জানা গেছে, রাজধানীকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা বৃহত্ কোচিং সেন্টারগুলো ঢাকার বাইরে একের পর এক শাখা খুলছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের দৌড়াদৌড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পর্যন্ত সাত-আট মাস তারা ব্যয় করেন কোচিং সেন্টারের পেছনে। অনেকে তিন-চারটি কোচিং সেন্টারেও পড়ে থাকেন। কোচিংয়ে ভর্তি না হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়ার নজির খুব কম।