গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা, সত্য উদ্ঘাটন করা এবং সরকারের পাশাপাশি বিরোধী পক্ষের কাজেরও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করা। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং সর্বাধিক প্রচলিত দৈনিক ‘প্রথম আলো’ দীর্ঘদিন ধরে দেশের গণমাধ্যম জগতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে পত্রিকাটির বস্তুনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতা নিয়ে সুধীসমাজ, গবেষক ও সাধারণ পাঠকের মনে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম আলো আসলেই কতটা নিরপেক্ষ—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এর সংবাদ পরিবেশন শৈলী, ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং কিছু সুনির্দিষ্ট উদাহরণের মুখোমুখি হতে হয়।
প্রথম আলোর পক্ষে যারা কথা বলেন, তারা এর পেশাদারিত্ব, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং আধুনিক বিন্যাসশৈলীর প্রশংসা করেন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পত্রিকাটি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয় সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে, দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নারী অধিকার, মানবাধিকার লংঘন এবং পরিবেশগত সংকট নিয়ে প্রথম আলোর রিপোর্টগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। করোনাকালীন স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম বা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মতো জটিল বিষয়গুলোতে প্রথম আলো যে জোরালো ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক পাঠকের মতে, সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আপসহীন মনোভাবই পত্রিকাটিকে দেশের অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমে পরিণত করেছে।
তবে এর বিপরীত চিত্রও কম শক্তিশালী নয়। অনেক সমালোচকদের মতে, প্রথম আলো কাগজে-কলমে নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শগত পক্ষপাতদুষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে, বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সংবাদ নির্বাচন ও শিরোনাম করার ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ উঠেছে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রথম আলো মূলত মধ্যপন্থী ও উদারনৈতিক রাজনীতির পক্ষপাতী এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি রয়েছে, যা অনেক সময় তাদের সংবাদ পরিবেশনকে প্রভাবিত করে।
প্রথম আলো কাগজে-কলমে নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শগত পক্ষপাতদুষ্টতা রয়েছে।
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে ২০০৭-২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের কথা উল্লেখ করা হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, ওই সময়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন এবং রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে প্রথম আলো এবং এর কিছু জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ মনে করে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করার মাধ্যমে পত্রিকাটি নিরপেক্ষতার সীমা লঙ্ঘন করেছিল।
এর বাইরেও, মাঝেমধ্যে প্রথম আলোর কিছু প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয় সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু বিষয় যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাতে রক্ষণশীল সমাজের একটি বড় অংশ পত্রিকাটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ২০২৩ সালের স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশিত একটি সংবাদের কারণে সৃষ্ট সামাজিক ও আইনি জটিলতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতার মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখাটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছিল। ওই ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদটির সত্যতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল, যা প্রথম আলোর নিরপেক্ষতার দাবিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল।
সুতরাং, গণমাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা একটি আদর্শিক ধারণা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। প্রথম আলো একাধারে যেমন দেশের অন্যতম সেরা অনুসন্ধানী ও পেশাদার সংবাদমাধ্যম, তেমনি এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও আদর্শিক প্রবণতার অভিযোগও সত্য। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনো গণমাধ্যমই ভুল বা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। প্রথম আলোকে যদি সত্যিকার অর্থেই দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে থাকতে হয়, তবে তাদের সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে আরও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনমুখী সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: মিঞা মো. নুজহাতুল হাচান, সাংবাদিক ও লেখক।





