গোশত বহু মানুষের প্রিয় খাবার। তবে ভাত বা রুটি সঙ্গেই এটি বেশি মানানসই। আপনি হয়তো শুনেছেন আজকাল অনেকেই গোশত খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে কিংবা খাবারের তালিকা থেকে এই গোশতকে একেবারেই বাদ দিতে চাইছেন। এমন লোকদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়।
এসব লোকদের মধ্যে কেউ স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপন, কেউ পরিবেশ রক্ষা কিংবা পশুপাখির জীবনের কথা ভেবেই গোশত খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বলা হচ্ছে, লন্ডনে প্রতি তিনজনের একজন গোশত খাওয়া একেবারেই বাদ, কিংবা কমিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রে এমন লোকদের সংখ্যা প্রতি তিনজনে দু’জন।
২০১৮ সাল থেকে গোশত খাওয়া কমিয়ে দেওয়ার জন্য সারা বিশ্বে একটি প্রচারণা শুরু হয়। তখন প্রত্যেক সোমবারকে গোশত-মুক্ত দিন হিসেবেও ঘোষণা করা হয়। বলা হয়- অন্তত এই দিনটিতে যেন লোকজন গোশত কিংবা যেকোনো ধরনের প্রাণীজাত খাদ্য পরিহার করেন। এর অংশ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকেও কম গোশত খাওয়ার উপকারিতা তুলে ধরা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবে কী আসলেই এসবের কোনো প্রভাব পড়ছে?
আমরা জানি, সারা বিশ্বে গত ৫০ বছর ধরে গোশত খাওয়ার পরিমাণ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।১৯৬০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে পাঁচ গুণ বেশি গোশত উৎপাদিত হচ্ছে।
হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ষাটের দশকে সাত কোটি টন গোশত উৎপাদিত হতো, কিন্তু ২০১৭ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি টন।
এর সবচেয়ে বড় কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। মানুষের খাবারের যোগান দিতেই গোশতের উৎপাদন পাঁচগুণ বাড়ানো হয়েছে বলেই মনে করা হয়। শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই গোশত খাওয়ার পরিমাণ পাঁচগুণ বাড়েনি। এর পেছনে বড় একটি কারণ হচ্ছে মানুষের আয় বৃদ্ধি।
১৯৬০-এর দশকে আমাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি, কিন্তু এখন এই সংখ্যা সাড়ে ৭০০ কোটিরও বেশি।
গত অর্ধ শতাব্দীতে গড় আয় বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। আমরা যদি তুলনা করে দেখি কোথায়, কত গোশত খাওয়া হচ্ছে, তাহলে দেখবো যেসব দেশ যত বেশি ধনী, সেসব দেশে তত বেশি গোশত খাওয়া হচ্ছে।
কারা সবচেয়ে বেশি গোশত খায়
স্ট্যাটিস্টা গবেষণা বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা, যেখানে ৯৭ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গোশত খান।
এরপরেই রয়েছে লিথুয়ানিয়া ও ব্রাজিল, এখানকার ৯৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গোশত খান। লিথুয়ানিয়া খাদ্যতালিকায় মূলত শুয়োর, গরু ও মুরগির গোশত অন্তর্ভুক্ত।
মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার ঐতিহ্যগতভাবে জাপানি খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য পেলেও গোশত খাওয়ার তালিকায় এর পরেই রয়েছে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। যেখানে ৯৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গোশত খান।
তালিকার এরপরের অবস্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা, রাশিয়া, নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ড । যাদের গোশত খাওয়ার হার ৯৪ শতাংশ। এই দেশেগুলোতে একজন ব্যক্তি বছরে ১০০ কেজির বেশি গোশত খান, যা প্রায় ৫০টি মুরগি কিংবা একটি গরুর অর্ধেকের সমান।
এছাড়া, চীন ৯৩, জাপান ৯২ ,আর্জেন্টিনা ৯১, ফ্রান্স ৯০, জার্মানি ৮৯ ও মেক্সিকো ৮৮ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গোশত খেয়ে থাকেন।
গোশত খাওয়ার এই উচ্চ হার পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই রয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে একজন মানুষ বছরে ৮০ থেকে ৯০ কেজি গোশত খেয়ে থাকেন। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যাবে গরিব দেশগুলোতে। গরিব দেশের লোকজনের গোশত খাওয়ার পরিমাণ খুবই কম।
ইথিওপিয়ায় একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে প্রায় সাত কেজি, রোয়ান্ডায় আট কেজি এবং নাইজেরিয়াতে ৯ কেজির মতো গোশত খেয়ে থাকেন। ইউরোপের একজন নাগরিক চেয়ে গড়ে দশগুণ কম গোশত খান এসব দেশের মানুষ।
নিম্ন আয়ের বেশিরভাগ দেশগুলোতেই গোশত এখনো একটি বিলাসবহুল খাদ্য। ওপরে যেসব পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হিসেব করা হয়েছে শুধু কতটুকু গোশত খাওয়া হচ্ছে সেটা বিবেচনা করে। কিন্তু বাড়িতে বা দোকানপাটে যেসব গোশত ফেলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা এসব হিসেবে ধরা হয়নি।
যেসব দেশে গোশত খাওয়ার চাহিদা বাড়ছে
এটা একেবারেই পরিষ্কার ধনী দেশগুলোতে প্রচুর গোশত খাওয়া হয় আর দরিদ্র দেশগুলোতে খাওয়া হয় কম। গত ৫০ বছর ধরে এই প্রবণতাই চলে আসছে। কিন্তু কথা হলো আমরা সবাই মিলে এখন এত বেশি গোশত খাচ্ছি কেন?
এ রকম হওয়ার পেছনে একটা কারণ হচ্ছে বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই গোশত খাওয়ার ব্যাপারে বড় রকমের চাহিদা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকে চীন ও ব্রাজিলে বড় রকমের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গোশত খাওয়ার পরিমাণও।
কিন্তু চীনে এই পরিবর্তনটা ব্যাপক। ষাটের দশকে একজন চীনা বছরে পাঁচ কেজিরও কম গোশত খেতেন, আশির দশকে সেটা বেড়ে দাঁড়াল ২০ কেজি। অবাক হওয়ার বিষয় গত কয়েক দশকে এটা বেড়ে হয়েছে ৬০ কেজি।
একই ঘটনা ঘটেছে ব্রাজিলেও। দেশটিতে গোশত খাওয়ার পরিমাণ ১৯৯০-এর দশকের পর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ছাড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোকেও।
ভারতে ১৯৯০-এর পর গড় আয় প্রায় তিনগুণ হয়েছে, কিন্তু গোশত খাওয়ার পরিমাণ সেভাবে বাড়েনি। মানুষের মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে বেশিরভাগ ভারতীয় নিরামিষভোজী। কিন্তু সারা ভারতে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, এখানে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ গোশত খায়।
তারপরেও দেশটিতে গোশত খাওয়ার হার উল্লেখযোগ্য রকমের কম। একজন ভারতীয় বছরে গড়ে চার কেজি গোশত খান। এর পেছনে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণ থাকতে পারে। অনেক ধর্মেই গোশত খেতে বারণ করা হয়েছে। যেমন হিন্দুরা গরুর গোশত বর্জন করেন।
বাংলাদেশসহ যে দেশগুলো সবচেয়ে কম গোশত খায়
গোশত খাওয়ার ক্ষেত্রে আফ্রিকার অনেক দারিদ্র্যপিড়ীত দেশ ও পাকিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশিরা।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যানুসারে, মাথাপিছু হারে গোশত খাওয়ার পরিমাণ কম, এমন দেশগুলোর তালিকায় এশিয়া থেকে আছে তিনটি দেশ। সবচেয়ে কম গোশত খাওয়া এশীয় দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যথাক্রমে ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই গোশত সবচেয়ে কম খাওয়া হয়। আর সারা বিশ্বে সবচেয়ে কম গোশত খাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। গরুর গোশত জনপ্রিয় হলেও চড়া দামের কারণে এদেশে বছরে মাথাপিছু গরুর গোশত খাওয়ার পরিমাণ মাত্র ০.৯ কেজি। এ গোশতের অধিকাংশই খাওয়া হয় ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদের সময়। বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি খায় পোল্ট্রি মুরগির গোশত। বছরে মাথাপিছু ১.৩৬ কেজি পোল্ট্রি মুরগির গোশত খায় এদেশের মানুষ।
আফ্রিকা মহাদেশের পাঁচ দেশ ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, তাঞ্জানিয়া, মোজাম্বিক ও ঘানাও রয়েছে এ তালিকায়। আর একমাত্র ক্যারিবীয় দেশ হিসেবে রয়েছে হাইতি।
ইথিওপিয়ার মানুষ মাথাপিছু ২.৫৮ কেজি গরু এবং ০.৪৫ কেজি মুরগির গোশত খেয়ে থাকেন।
এছাড়া, তাঞ্জানিয়া মানুষ ৭, মোজাম্বিক ৭.২৬, ঘানা ৯.০৭, ইন্দোনেশিয়া ১২, পাকিস্তান ১২.৭, হাইতি ১৩.৬ কেজি গোশত খায়।
পশ্চিমে কী গোশত খাওয়া কমছে?
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় অনেকেই বলছেন তারা গোশত খাওয়া কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আসলেই কি সেরকম কিছু হচ্ছে? পরিসংখ্যান কিন্তু সেরকম কিছু বলছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের সবশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে দেশটিতে বরং মাথাপিছু গোশত খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
আমরা হয়তো ভাবতে পারি যুক্তরাষ্ট্রে গোশতের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালে দেশটিতে গোশত খাওয়ার পরিমাণ ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রকমের বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেও একই রকম চিত্র।
পশ্চিমা দেশগুলোতে গোশত খাওয়ার হার যখন থিতু অবস্থানে রয়েছে, অথবা সামান্য বেড়েছে, তখন গোশতের ধরনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তার অর্থ হচ্ছে- লোকজন এখন রেড মিট অর্থাৎ গরু বা শূকরের গোশত খাওয়া কমিয়ে হাঁস মুরগির দিকে ঝুঁকছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যত গোশত খাওয়া হয় তার অর্ধেক হাঁস-মুরগির। কিন্তু সত্তরের দশকে এটা ছিল এক চতুর্থাংশ। তবে এই পরিবর্তনকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যে ইতিবাচক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গোশত খেলে কী হয়
কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোশত খাওয়া ভালো। পরিমাণ মতো গোশত ও দুগ্ধজাত খাবার খেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। তবে বেশিরভাগ দেশেই এমন পরিমাণে গোশত খাওয়া হয় যা লাভের বদলে ক্ষতিই করে থাকে। স্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে এই গোশত।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিমাণে রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত গোশত খেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিছু কিছু ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে।
রেড মিটের বদলে হাঁস-মুরগির গোশত খাওয়া ইতিবাচক। মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবেশের জন্যেও এটা একটা সুখবর। কিন্তু তারপরেও ভবিষ্যতে মানুষের গোশত খাওয়ার অভ্যাসে আরো বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা।
তার মানে শুধু গোশতের ধরনে পরিবর্তন আনলেই হবে না, বরং আমরা কতটুকু গোশত খাচ্ছি সেদিকেও নজর দিতে হবে।
বস্তুত, গোশতকে আবারো বিলাসী খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস ডটকম ও অন্যান্য








