ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের বিরুদ্ধে নির্বাচনি হলফনামায় ভুয়া শিক্ষাগত সনদ দাখিলের অভিযোগ উঠেছে। ওই আসনের ভোটার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত পর্যবেক্ষণ জানান, নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি তদন্ত বা পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই এই রিট করা হয়েছে। এ কারণে রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন আদালত।
তবে দেড় মাস বন্ধের পর যথাযথভাবে আবেদন করলে রিট শুনবেন বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী রাফসান আল আলভী।
হাইকোর্টে দাখিল করা রিটে বাদী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ সংসদীয় আসন নং-১১৮, ভোলা -৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) নির্বাচনী এলাকার বর্তমান সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের নির্বাচনি হলফনামায় জাল সার্টিফিকেট ও মিথ্যা তথ্য প্রদান করায় তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন। রিটাকারী নয়নের নির্বাচনী এলাকা চরফ্যাশন উপজেলার ভোটার।
সরকার পক্ষে ডিএজি শুনানিতে বলেন, গত ২৫ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে রিটকারী দরখাস্ত দায়ের করেন আর ৩১ আগস্ট রিটের এফিডেভিট করা হয়। নির্বাচন কমিশনকে ইনকোয়ারি কমিটি গঠনের সময় না দিয়ে রিট করা হয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে সময় দিয়ে কিছুদিন পর শুনানি করতে অভিমত প্রকাশ করেন।
এর আগে, রিটকারী গত ২৫ আগস্ট নির্বাচনি হলফনামায় নানা মিথ্যা তথ্য ও জাল সার্টিফিকেট প্রদানের মাধ্যমে জনগণকে প্রতারণা করায় আরপিও এর ৯১ এফ ধারায় নয়নের সদস্য পদ বাতিল চেয়ে দরখাস্ত দায়ের করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী বিষয় বর্ণিত সংসদীয় আসনে একজন স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার বটে। উক্ত সংসদীয় এলাকা হতে বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে মো. নুরুল ইসলাম নয়ন নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার নির্বাচনী হলফনামায় সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উল্লেখ করে ইবাইস ইউনিভার্সিটি (সংযুক্তি-২) হইতে মাস্টার অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন উইথ মেজর ইন ম্যানেজমেন্ট সিজিপিএ ৩.২৮, নভেম্বর ২০০৮-এর সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন। ইবাইস ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে উক্ত সার্টিফিকেটখানা জাল হিসেবে উল্লেখ করে উক্ত সার্টিফিকেটটি তাদের বিশ্ববিদ্যলয়ের নয় মর্মে জানিয়েছেন (সংযুক্তি-১)। অর্থাৎ, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরল ইসলাম নয়ন তার হলফনামায় মিথ্যা শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ করে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে আমিসহ উক্ত সংসদীয় আসনের লক্ষ লক্ষ ভোটারদের প্রতারিত করেছেন।
রিটে আরও উল্লেখ, পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্ণিত সংসদ সদস্য মো. নুরল ইসলাম নয়ন তার বক্তব্য-বিবৃতিসহ সর্বত্রই প্রচার করেছেন ও প্রচারিত আছে যে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি তার শিক্ষাগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন বলে প্রচার করে থাকেন। সে মতে তিনি তার ছাত্র রাজনীতির জীবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিকবারের সহ-সভাপতিসহ বর্তমানে যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্র রাজনীতির সময়কালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে সর্বত্রই পরিচিতি লাভ করেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ছাত্র হিসেবে কোথাও তার নামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে সার্টিফিকেট ও মার্কসিট শাখায় মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন পিতা- মোহাম্মদ মহিউদ্দিন মিয়া নামে ইংরেজি বিভাগের ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে থেকে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত কোন ছাত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইহা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি কোনকালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না।
আরও উল্লেখ্য যে, উক্ত সংসদ সদস্য তার উইকিপিডিয়াতে তথ্য সরবরাহ করেছেন যে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ হতে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ইহা বিদিত যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রের আবাসিক হলে তার ভর্তি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকে। রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং এর মার্কসীট ও সার্টিফিকেট শাখায় প্রতিটি ছাত্রের ভর্তি ও একাডেমিক ফলাফল সহ যাবতীয় তথ্যাদি সংরক্ষিত থাকে। উক্ত সংসদ সদস্যের কথিত আবাসিক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ও রেজিষ্ট্রি বিল্ডিংয়ের মার্কসিট ও সার্টিফিকেট শাখায় মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, পিতা- মো. মহিউদ্দিন মিয়া নামক ইংরেজি বিভাগের কোন ছাত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নাই। অথাৎ বর্ণিত সংসদ সদস্য হলফনামায় মিথ্যা তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দিয়ে আমিসহ চরফ্যাশন ও মনপুরার নির্বাচনী এলাকার লাখো লাখো ভোটারদের প্রতারিত করেছেন।
দরখাস্তে তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংসদ সদস্য নয়ন ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে অত্র নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলেন। তিনি তার তৎকালীন দাখিলকৃত হলফনামায় সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ অর্থাৎ মাস্টার অব আর্টস হিসেবে হলফনামা দাখিল করেছিলেন। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের এমএ পাস সংসদ সদস্য প্রার্থী ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনি হলফনামায় এমবিএ পাস হিসেবে উল্লেখ করা হাস্যকর বটে। শুধু তাই নয়, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের হলফনামায় সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি মাত্র তাহার ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি পাশের সার্টিফিকেট দাখিল করেছিলেন।
রিটকারী চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন যে, বর্ণিত সংসদ সদস্য বিগত ২০১৮ ও ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনি হলফনামাগুলোতে প্রতারণামূলকভাবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখিয়ে ও জাল সার্টিফিকেট দাখিল করে এবং তার রাজনৈতিক জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও ভুয়া ছাত্রের পরিচয় দিয়ে আমিসহ চরফ্যাশন ও মনপুরা নির্বাচনী এলাকার লাখো লাখো ভোটারদের প্রতারিত করেছেন। এমন একজন ঠক, মিথ্যাবাদী, প্রতারক ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে মহান পবিত্র সংসদকে অপবিত্র করেছেন। যা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বটে। উক্ত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আরপিও, ১৯৭২-এর ৯১ এফ ধারার বিধান মোতাবেক সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে মহান সংসদকে কলঙ্কমুক্ত করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করবার জন্য বিনীত প্রার্থনায় অত্র দরখাস্তখানা আপনার সমীপে আনয়ন করা হলো। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিজ্ঞ আইনজীবী রাফসান আল আলভী রিটকারীর পক্ষে উক্ত রিটটি দায়ের করেন। ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রেজিস্ট্রার আলমগীরের হোসেন সংসদ সদস্য নয়নের ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে দাখিলকৃত সার্টিফিকেটটি তাদের নয় মর্মে চিঠি ইস্যু করেন এবং সার্টিফিকেটটি ‘চেকড এণ্ড ফেইক’ মর্মে সিল দিয়ে সই-স্বাক্ষর করে দিয়েছেন।
ভোলা-৪ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়নের ভুয়া সনদ দাখিলের অভিযোগে বাদী ওই আসনের ভোটার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানিয়ে রিটে বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাফসান আল আলভী বলেন, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন তার নির্বাচনি হলফ নামায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতার যে সনদ দাখিল করেছেন, তা অসত্য। ইবাইস নামের যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তিনি দাখিল করেছেন; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার সনদকে জাল বলে সত্যায়িত করেছেন, যা আমরা মহামান্য আদালতে দাখিল করেছি।
তিনি বলেন, অসত্য তথ্য দিয়ে তিনি বাদী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার লাখো ভোটারের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। সেই কারণে বাদী মহামান্য হাই কোর্টের আপিলেট ডিভিশনে রিট করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিলেট ডিভিশনের আইনজীবী রাফসান বলেন, আজকে রিটটি আদালতের কার্যতালিকাভুক্ত ছিল। প্রথম দিনের শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। আদালত ভ্যাকেশন শেষে পরবর্তী শুনানি শুনবেন।
এ বিষয়ে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, যে কেউ যেকোনো অভিযোগে রিট করতেই পারেন। এটা তার আইনগত অধিকার। আদালত যদি এ বিষয়ে রুলিং দেন, সে প্রেক্ষিতে আমি আইনগতভাবেই ব্যবস্থা নেব।
নুরুল ইসলাম নয়নের আইনজীবী মনির হোসেন বলেন, রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক ষড়যন্ত্র করে। এই রিটও সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। রিটের গ্রাউন্ড না থাকায় ইতোমধ্যেই কোর্ট খারিজ করে দিয়েছেন।
নুরুল ইসলাম নয়নের সনদের বিষয়ে জানতে ইবাইস ইউনিভার্সিটির রেজিস্টার আলমগীর হোসেনের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।





