ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ছে না জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে ঐক্যের ভিত্তিতে এই জোট গঠিত হলেও সম্প্রতি দূরত্ব বাড়ানোর কথা জানিয়েছে খেলাফত মজলিস। এরপর এনসিপিও ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ছে বলে ‘গুজব’ ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, এমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নেপথ্যে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে বিরোধী জোট রাজপথে নামায় এই কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে মনে করে দল দুটি।
এনসিপির শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি চলমান রয়েছে, জোটের বৈঠকও ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। জোটের ফোরামে বা এনসিপির দলীয় ফোরামে জোট ছাড়ার কোনো আলোচনা হয়নি। এনসিপির জোট ছাড়ার বিষয়টি গুজব। বানোয়াট প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে জোটের শরিকদের বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে। বিরোধী জোটকে দুর্বল করতে ভাঙন সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। সরকারের ইন্ধনে একটি মহল এই অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে শরিক দলগুলোকে সজাগ ও সতর্ক থাকবে হবে।
এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাই মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে যখন রাজপথে জোটগত আন্দোলন চলছে, তখন জোটকে আরো সংহত করতে হবে। সংগঠিত ও সম্মিলিতভাবে সরকারকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। শরিকদের বিচ্ছিন্নতা নয়, আরো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
এ বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এনসিপির জোট ছাড়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট। এর কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের প্রোপাগান্ডা আমরা আমলে নিচ্ছি না। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও আমাদের একই কথা জানিয়েছেন। আমরা মনে করি, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ইন্টেনশনালি এ ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এর পেছনে সরকারের ইন্ধন আছে। তবে এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে আছি।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ আগস্ট রাজধানীর পল্টনে বড় সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সমাবেশ থেকেই জোটের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান নেতারা। বৈঠকে জোটের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি এনসিপির প্রতিনিধি হিসেবে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আমার দেশকে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের গণরায় মানতে সরকারকে বাধ্য করতে ১১ দলীয় ঐক্য ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। সামনেও জোটের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এমন সময়ে এনসিপির জোট ছাড়ার প্রসঙ্গ কেন আসবে! আমরা স্পষ্ট করে বলছি, এই মুহূর্তে জোট ছাড়ার কোনো চিন্তাভাবনা এনসিপির নেই।
এনসিপির দলীয় সর্বোচ্চ ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের অন্তত চারজন নেতা জানিয়েছেন, এনসিপি ১১ দলীয় ঐক্যে থেকেই নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে চায়। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছে, যার ব্যাপ্তি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা দলের তৃণমূলকে চাঙা করার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। সে কারণে নিজস্ব সাংগঠনিক বিকাশ এবং বিচার, সংস্কার প্রশ্নে জোটগতভাবে এগোনোর নীতি অবলম্বন করছে এনসিপি।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রার কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার ২৮ ঘণ্টা পর বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানায় জামায়াতে ইসলামী। যদিও হামলার ঘটনায় ওই রাতেই বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানায় ইসলামী ছাত্রশিবির। পরে প্রতিবাদ জানায় ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জোটের কর্মসূচি থেকে দূরে থাকা খেলাফত মজলিস। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের তাৎক্ষণিক কড়া প্রতিক্রিয়া না দেখানোর কারণে ফেসবুকে সমালোচনা করেছেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। জামায়াতের নেতাকর্মীদেরও পাল্টাপাল্টি সমালোচনা করতে দেখা যায়। তবে দল দুটির সিনিয়র নেতারা বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমের বিতর্কের রাজনীতিতে প্রভাব নেই।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলীয় জোটে দর কষাকষির গুঞ্জন রয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোয় জামায়াত ও এনসিপি আলাদা দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ক্ষেত্রে জোটবদ্ধভাবে নাকি এককভাবে নির্বাচন করবে ১১ দলীয় জোট, তা নিয়ে এক ধরনের কষাকষি রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে এনসিপির দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক নেতা বলেন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচনের পক্ষে দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিল। সিটি করপোরেশনেও একক নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। তবে এই নির্বাচনে জাতীয় আমেজ থাকায় মেগাসিটিগুলোয় জোটগতভাবে নির্বাচন করলে উভয়পক্ষই লাভবান হবে, এমনটা মনে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে জোটগত সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো আছে। আলোচনাসাপেক্ষে কৌশল নির্ধারণের পক্ষে জোটের নেতারা।
সূত্র: আমার দেশ





