ঢাকা | শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,২১ কার্তিক ১৪৩৩

রূপের আড়ালে এক নষ্ট পরীর গল্প

এক দেশে এক পরী ছিল। পরীটা ছিল অসম্ভব রূপবতী। তার রূপের ঝলকে অনেকেই মুগ্ধ হতো। আর সেই মুগ্ধতা থেকেই ধীরে ধীরে সমাজে তার পরিচিতি বাড়তে লাগল। একসময় সেই পরিচিতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ল। পরীও তাতে বেজায় খুশি।

কারণ সবাই তার গুণকীর্তন করে, তার সান্নিধ্য পেতে চায়, তার চারপাশে ঘুরঘুর করে, তার মনোরঞ্জন করতে চায়। আর পরীও বুঝে গেল—তার সৌন্দর্যই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে নিজের চারপাশে এমন একটি বলয় তৈরি করল, যেখানে ক্ষমতাবান, বিত্তবান, প্রভাবশালী ও সুবিধাবাদী মানুষের আনাগোনা কখনোই কমে না।

পরী সুন্দরী ছিল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সৌন্দর্য আর চরিত্র তো এক জিনিস নয়। একজন মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য তাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার আচরণ, মূল্যবোধ, সংযম, বিবেক এবং অন্য মানুষের প্রতি সম্মানবোধ দিয়ে।

কিন্তু আমাদের সমাজও বড় বিচিত্র!

এখানে সুন্দর মুখের কদর অনেক সময় চরিত্রের চেয়েও বেশি। ক্ষমতাবানদের সামনে নীতিবোধের চেয়ে সৌন্দর্য, পরিচিতি ও প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে কোনো কোনো সুন্দরী নারী কিংবা পুরুষ যখন নিজের সৌন্দর্য ও জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান, তখন সমাজেরই এক শ্রেণির মানুষ তাঁকে সেই সুযোগ করে দেয়।

পরীও সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে লাগল।

তার জীবনে একের পর এক সম্পর্ক, বিতর্ক, ঘটনা ও কাহিনি তৈরি হতে লাগল। কখনো প্রেম, কখনো বিয়ে, কখনো বিচ্ছেদ, কখনো মামলা, কখনো ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আলোচনা—সব মিলিয়ে পরী যেন নিজেই একটি চলমান সংবাদ।

অবশ্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু যখন ব্যক্তিগত জীবন বারবার জনসমক্ষে আসে এবং তার সঙ্গে বিতর্ক, মামলা কিংবা প্রকাশ্য আচরণের প্রশ্ন যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না—তা জনআলোচনার অংশ হয়ে যায়।

আর আমাদের সেই পরীর নাম—পরীমনি।

পরীমনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের বহুল আলোচিত একজন অভিনেত্রী। তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন ও বিভিন্ন বিতর্কও তাঁকে বারবার সংবাদ শিরোনামে এনেছে। ২০২১ সালের বোট ক্লাব-সংক্রান্ত ঘটনা, পরবর্তীতে মামলা-পাল্টা মামলা, মাদক মামলা এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে আলোচনা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন বিতর্কের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে।

তবে এসব ঘটনার বিচার আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়—এ কথাটিও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রকাশ্য আচরণের দায় কি তাহলে কারও নেই?

অবশ্যই আছে।

আদালত চত্বরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

গতকাল, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে আদালতে যান পরীমনি। এর আগের দিন আদালত তাঁর জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। পরদিন তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।
কিন্তু আদালত থেকে বের হওয়ার সময় যা ঘটেছে, সেটিই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছবি ও ভিডিও করার সময় পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন। একপর্যায়ে একজন সাংবাদিকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে পরীমনি নিজেও ওই সাংবাদিকের দিকে তেড়ে যান এবং সাংবাদিকদের গালিগালাজ করেন—এমন অভিযোগও সংবাদে এসেছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতেও ঘটনাটির কিছু অংশ দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই ঘটনায় তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় একজন বিচারপ্রার্থীর মাথা ফেটে রক্তপাতের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই আমার আপত্তি।

একজন শিল্পী জনপ্রিয় হতে পারেন। তিনি শত শত মানুষের প্রিয় হতে পারেন। তাঁর চারপাশে নিরাপত্তারক্ষী থাকতে পারেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষার অধিকারও রাখেন।

কিন্তু সাংবাদিকের ছবি তোলার কারণে তাঁর মোবাইল কেড়ে নেওয়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি বা গালিগালাজ—এসব কি একজন জনপ্রিয় শিল্পীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত আচরণ হতে পারে?

আমার উত্তর—না।

আরও বড় কথা হলো, ঘটনাটি কোনো সাধারণ জায়গায় ঘটেনি। ঘটেছে আদালত চত্বরে। আদালত এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আসে। সেখানে একজন বিচারপ্রার্থী আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে—এটি নিছক তারকা-সাংবাদিক বিরোধ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন?

আমি কোনো পেশাদার সাংবাদিক নই। তবে লেখালেখি করি। আমার লেখা ছোট-বড় কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই সূত্রে বহু সাংবাদিকের সঙ্গে আমার পরিচয়, চলাফেরা ও ওঠাবসা রয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার একটি আলাদা ভালোবাসা ও সম্মানের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ আমি মনে করি, একজন সাংবাদিক শুধু ছবি তোলেন না বা খবর লেখেন না—তিনি সমাজের আয়না হিসেবেও কাজ করেন।

কোনো তারকা যখন আলোচনায় আসেন, সাংবাদিকই তাঁর খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।

কোনো শিল্পী যখন নতুন সিনেমায় অভিনয় করেন, সাংবাদিকই তাঁর কাজের প্রচার করেন।

কোনো তারকার সাফল্য যখন সংবাদ হয়, তখনও সাংবাদিকই তা মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

অথচ সেই সাংবাদিকই যখন কোনো তারকার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা ছবি তুলতে চান, তখন তাঁকে শত্রু মনে করা হবে—এমন মানসিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তারকা হওয়া মানে কি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যাওয়া?

কখনোই নয়।

জনপ্রিয়তা মানুষকে সম্মান দিতে পারে, কিন্তু আইন থেকে ঊর্ধ্বে তুলতে পারে না।

অর্থ, সৌন্দর্য, জনপ্রিয়তা কিংবা ক্ষমতা—কোনোটিই কাউকে অন্য মানুষের প্রতি অসম্মান করার লাইসেন্স দেয় না।

বরং জনপ্রিয় মানুষদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ তাঁদের আচরণ অনুসরণ করে তরুণ প্রজন্ম। তাঁদের কথাবার্তা, পোশাক, জীবনযাপন, এমনকি রাগ প্রকাশের ধরনও অনেকের কাছে অনুসরণীয় হয়ে ওঠে।

তাই একজন তারকার ভুল আচরণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ভুল থাকে না; তা সমাজে একটি বার্তাও তৈরি করে।
পরীর আসল সৌন্দর্য কোথায়?

রূপের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী।

আজ যে মুখ দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়, কাল সেই মুখের সৌন্দর্য হয়তো আগের মতো থাকবে না। কিন্তু একজন মানুষের ব্যবহার, ভদ্রতা, মানবিকতা, সংযম এবং অন্যের প্রতি সম্মান—এসবই তাকে দীর্ঘদিন মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখে।

তাই পরীর আসল সৌন্দর্য তার মুখে নয়, তার আচরণে।

আর সেই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে।

পরীমনি চাইলে তাঁর অভিনয় দিয়ে, তাঁর প্রতিভা দিয়ে, তাঁর সাফল্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। তাঁকে প্রতিটি মুহূর্তে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতে হবে না।

কারণ আলোচনায় থাকার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা অনেক বড় অর্জন।

আমি তাই কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা করতে চাই না। কিন্তু একজন প্রকাশ্য ব্যক্তিত্ব যখন প্রকাশ্য স্থানে এমন আচরণের অভিযোগের মুখোমুখি হন, তখন প্রশ্ন তোলা নাগরিক ও লেখক হিসেবে আমাদের অধিকার।

সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

সাংবাদিকের মোবাইল কেন কেড়ে নেওয়া হলো?

সাংবাদিকদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি কেন হলো?

একজন বিচারপ্রার্থী কীভাবে আহত হলেন?

এ ধরনের আচরণের জন্য কেউ কি দায় নেবে?

একজন সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় কেন গালিগালাজ করা হলো?

এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের মূল উৎস বা সাহসটাই পেল কোথায়?

এগুলো ব্যক্তিগত বিদ্বেষের প্রশ্ন নয়। এগুলো জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

আর সেই কারণেই আমি পরীমনির সাম্প্রতিক অভদ্র, অসৌজন্যমূলক ও আগ্রাসী আচরণের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই—ঘটনাটি যেহেতু জনসম্মুখে ঘটেছে এবং এর কিছু অংশের ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে, তাই সাংবাদিকদের মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনাی নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তা না হলে সাংবাদিক সমাজ যদি এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামে এবং ফুঁসে ওঠে, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

পরীমনিকে এখানে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে চাই না। কারণ সাংবাদিকরা চাইলে যেকোনো প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ডকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারেন। আমার চাওয়া হলো—এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক, যাতে করে ‘নষ্ট পরী’রা ভবিষ্যতে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার দুঃসাহস আর না পায়।

কারণ তারকা যত বড়ই হোন, সাংবাদিক যত ছোটই হোন, আদালত যত ব্যস্তই থাকুক—আইনের চোখে এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে সবাই সমান।

একজন পরীর রূপ মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে।

কিন্তু একজন মানুষের আচরণই শেষ পর্যন্ত বলে দেয়—সে সত্যিই পরী, নাকি কেবল পরীর মুখোশ পরে থাকা আরেকটি বিতর্কিত চরিত্র।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী
কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক