আমরা অপরাধী দেখলেই তাকে নিয়ে কথা বলি। সমালোচনা করি, ঘৃণা করি, বিষোদগার করি। তার অপরাধের বিচার চাই। কিন্তু আমরা কেউ কি কখনো নিজেদেরকে প্রশ্ন করি বা করেছি—একজন মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে কীভাবে?
অপরাধের শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি অপরাধের জন্ম কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি। কারণ প্রতিটি অপরাধের পেছনে একটি গল্প থাকে। সেই গল্প কখনো লোভের, কখনো প্রতিশোধের, কখনো বঞ্চনার, কখনো অবহেলার; আবার কখনো নিছক অপরাধপ্রবণতার।
সব অপরাধী এক নয়। কেউ জেনে-বুঝে অপরাধে জড়ায়, কেউ পারিবারিক বা সামাজিক পরিবেশ থেকে অপরাধের শিক্ষা পায়। আবার কেউ পরিস্থিতির চাপে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলায় কিংবা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে ধীরে ধীরে অপরাধের পথে পা বাড়ায়। প্রথম অপরাধটি কখন যে অভ্যাসে পরিণত হয়, আর অভ্যাস কখন পেশায় রূপ নেয়—অনেক সময় সেই সীমারেখাটিও অদৃশ্য হয়ে যায়।
তাই একজন অপরাধীর প্রথম অপরাধটি কেন ঘটেছিল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশুর হাতে অস্ত্র কেন?
আজ আমার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু পূর্ণবয়স্ক অপরাধী নয়; বরং সেই কিশোর, যে বয়সে তার মাঠে ক্রিকেট খেলার কথা, ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা।
সেই বয়সের একটি ছেলে কেন কোমরে অস্ত্র গুঁজে পাড়া-মহল্লায় ঘুরবে? কেন কয়েকজন সমবয়সী কিশোর একত্রিত হয়ে একটি অপরাধী দল তৈরি করবে? কেন আমরা তাদের ‘কিশোর গ্যাং’ নামে চিনব? এই প্রশ্নগুলো কি আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবায় না?
আমরা যখন কোনো কিশোরকে অস্ত্র হাতে দেখি, তখন প্রথমেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু তার হাতে অস্ত্র ওঠার আগের গল্পটি আমরা কতটা জানতে চাই?
হয়তো সে দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। হয়তো পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। হয়তো পরিবারে ছিল অশান্তি। হয়তো সে ভালোবাসা ও স্বীকৃতি খুঁজেছে এমন একটি দলের মধ্যে, যারা তাকে ভুল পথে নিয়ে গেছে। হয়তো প্রতিশোধের আগুন তাকে ধীরে ধীরে অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অথবা হয়তো সে এমন একটি সমাজে বড় হয়েছে, যেখানে অপরাধ করেও অনেককে সফল ও প্রভাবশালী হতে দেখেছে। তাহলে দায়টা কি শুধু সেই কিশোরের? বঞ্চনা থেকেই কি অপরাধের শুরু?
আমাদের সমাজের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই অনেক সময় অপরাধী চক্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়।
একটি শিশু হয়তো অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারে না। তার সামনে দিয়ে প্রতিদিন অন্য শিশুরা সুন্দর পোশাক পরে, দামি গাড়িতে চড়ে স্কুলে যায়। সে দেখে, অন্যদের জীবনে যে সুযোগগুলো আছে, তার জীবনে সেগুলোর অনেক কিছুই নেই।
তার ছোট্ট মনে তখন প্রশ্ন জাগে—“ওরা পারে, আমি পারি না কেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে দিতে না পারে, তাহলে ভুল মানুষগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
কেউ হয়তো তাকে কিছু টাকা দেয়। কেউ তাকে নিজের দলে টেনে নেয়। কেউ তাকে শক্তির স্বাদ দেয়। কেউ তাকে বোঝায়—ভয় দেখাতে পারাটাই ক্ষমতা। এভাবেই একটি শিশুর হাতে একদিন ক্রিকেট ব্যাটের পরিবর্তে উঠে আসতে পারে অস্ত্র।

নীরব অপরাধীদের কথা আমরা কতটা বলি?
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা দৃশ্যমান অপরাধকে যতটা ঘৃণা করি, অদৃশ্য অপরাধকে অনেক সময় ততটা গুরুত্ব দিই না।
একজন কিশোর অস্ত্র দেখিয়ে টাকা ছিনিয়ে নিলে আমরা তাকে সন্ত্রাসী বলি। কিন্তু একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ঘুষ আদায় করেন, তখন আমরা অনেক সময় সেটিকে ‘সিস্টেম’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই।
কিন্তু অপরাধের সংজ্ঞা কি ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যায়? একজন অস্ত্রধারী ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, আর একজন ঘুষখোর তার পদ ও ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে টাকা আদায় করে—পদ্ধতি ভিন্ন, কিন্তু দুটোই তো অন্যায় ও অপরাধ।
একজন রাস্তার অন্ধকারে মানুষকে ভয় দেখায়; অন্যজন অফিসের টেবিলের ওপাশে বসে সাধারণ মানুষকে নিয়ম-কানুনের জটিলতায় আটকে রেখে অর্থ আদায় করে।
একজনের হাতে অস্ত্র থাকে, অন্যজনের হাতে থাকে পদ, ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব। তাহলে সমাজের ‘নীরব সন্ত্রাসীদের’ নিয়েও কি আমাদের কথা বলা উচিত নয়? অবশ্যই উচিত।
সংশোধনাগার কি সত্যিই সংশোধন করছে?
কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে আমাদের আইনি এবং প্রচলিত পন্থা হলো—অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীকে সংশোধনাগারে পাঠানো হবে, সেখানে সে নিজেকে সংশোধন করবে এবং একদিন সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। ভাবনাটি সুন্দর। কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর?
একজন কিশোর অপরাধী যদি সংশোধনের জন্য গিয়ে সেখানে পর্যাপ্ত যত্ন, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং মানবিক পরিবেশ না পায়, তাহলে সে কীভাবে নিজেকে সংশোধন করবে?
শুধু একটি শিশুকে অপরাধীদের সঙ্গে আটকে রাখলেই তো সে সংশোধিত হবে না। বরং প্রয়োজন তার মানসিকতা বোঝা, তার পরিবারের পরিস্থিতি বোঝা, তার অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা এবং তাকে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। কারণ একটি শিশুকে শাস্তি দেওয়া যতটা সহজ, একটি শিশুকে নতুন করে গড়ে তোলা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
আর রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বও সেখানেই। আমরা কি শুধু ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত? একটি গাছের ফল খারাপ হলে আমরা ফলটি নিয়ে অভিযোগ করি। কিন্তু গাছটির শিকড়ে কী সমস্যা হয়েছে, মাটিতে কী ঘাটতি আছে, পানি ঠিকমতো পেয়েছে কি না—সেটা জানতে চাই না।
অপরাধের ক্ষেত্রেও আমরা অনেকটা তেমনই। অপরাধী তৈরি হওয়ার পর তাকে ধরছি, মামলা দিচ্ছি, শাস্তি দিচ্ছি। কিন্তু অপরাধী তৈরি হওয়ার আগের সময়টিতে আমরা কোথায় ছিলাম?
একটি শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে—আমরা কি খোঁজ নিয়েছি?
একটি পরিবার দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে—আমরা কি পাশে দাঁড়িয়েছি?
একটি কিশোর ভুল বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে—পরিবার বা সমাজ কি তা লক্ষ্য করেছে?
একটি শিশু ভালোবাসা ও স্বীকৃতির অভাবে ভুগছে—আমরা কি তা বুঝতে চেষ্টা করেছি?
প্রশ্নগুলো কঠিন। কিন্তু উত্তরগুলো খুঁজে বের করতেই হবে। অপরাধ দমন নয়, অপরাধ প্রতিরোধও জরুরি
অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধ নির্মূল করা যায় না।
অপরাধ দমন করতে হবে, পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে।
একজন কিশোরকে অপরাধী হওয়ার পর সংশোধন করার চেয়ে তাকে অপরাধী হয়ে ওঠার আগেই সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
তাই আমাদের প্রয়োজন—
শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, খেলাধুলার সুযোগ, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সর্বোপরি একটি মানবিক সামাজিক পরিবেশ।
একই সঙ্গে প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ—যে অপরাধীই হোক, তার পরিচয়, পদ, অর্থ কিংবা ক্ষমতা যেন বিচারের পথে বাধা না হয়।
কারণ অপরাধের কোনো পোশাক নেই। অপরাধী শুধু রাস্তায় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নয়; ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়াও অপরাধ।
শেষ কথা
আমরা যদি সত্যিই একটি নিরাপদ সমাজ চাই,তাহলে শুধু অপরাধীর মুখটি দেখলে হবে না; তার পেছনের অন্ধকারটাকেও দেখতে হবে।
একটি কিশোরের হাতে অস্ত্র ওঠার পর তাকে ধরার পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে—অস্ত্রটি তার হাতে ওঠার আগের দিনগুলোতে আমরা কী করেছিলাম?
হয়তো একটি শিশুকে সময়মতো ভালোবাসা দিলে সে অপরাধী হতো না। হয়তো তাকে স্কুলে ধরে রাখতে পারলে সে অপরাধী হতো না। হয়তো তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারলে সে অপরাধী হতো না।
হয়তো একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক কিংবা সমাজের একজন সচেতন মানুষ একটু আগে তার পাশে দাঁড়ালে একটি জীবন অন্যদিকে মোড় নিতে পারত।
তাই আসুন, অপরাধীর শাস্তির দাবি তোলার পাশাপাশি অপরাধের শিকড়টাকেও খুঁজে দেখি।
কারণ অপরাধীকে ধরলে একজন অপরাধী কমে; কিন্তু অপরাধী তৈরি হওয়ার কারণ দূর করতে পারলে ভবিষ্যতের অনেক অপরাধী তৈরি হওয়া ঠেকানো যায়। আর একটি শিশুকে অপরাধী হওয়ার আগেই বাঁচিয়ে ফেলতে পারা—সম্ভবত একটি সমাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখক: মোঃ কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক







