ঢাকা | শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

সত্তার পরিচয়

আঙুলগুলি যখন রাখলুম বিশ্বমন্ডলে
তখনই কেবল বুঝলুম আমি মনুষ্য।
রক্তখণ্ডে ছিলুম ঘোর অন্ধকারে,
মস্তিষ্কে ছিলাম পিতৃদেহ জুড়ে।

রক্তে ছিলাম নীরব স্রোতে, ছায়া ছুঁয়ে ঘুম,
উদরে যাওয়ার ছিল ধুম।
মনুষ্য আমি—মাটি-জলে, আগুন-হাওয়ার ছায়া,
কর্মে খুঁজি আপন আলো, প্রেমে খুঁজি মায়া।
বিশ্ব যদি মোর আয়না হয়, আমি তার প্রতিচ্ছবি,
জীবন মানেই সত্য খোঁজা—অন্তরতম রবি।

সত্তায় ছিলাম যখন নিঃশব্দ রক্তের দোলা,
পিতার দেহে ঘুমিয়ে থাকা এক অচেনা মেলা,
তখনও ছিল না ভাষা, ছিল না নাম,
ছিল শুধু সৃষ্টির রহস্য-স্নিগ্ধতায় ভরা।

গড়ে উঠল অস্থি, রক্ত, মন, দেহ জোড়া—
অঙ্গগুলি ধরলাম বিশ্বজননীর কোলে,
তখনই বুঝলাম, এসেছি এই ভূমন্ডলে!

শুধু শরীর নই, স্বপ্নরাশি,
মাটি ছুঁয়ে আকাশেও আসি।
চোখে আমার জগৎ দেখে আপন মুখ,
বোধে আসে—জীবনের ধরা দেয় নতুন সুখ।

মিলনে গিয়েছি মাতৃউদরে
নিভৃত আঁধারে এক আলোকস্বরূপে,
নির্বাক ভাষায় জেনেছি জীবনের উপাখ্যান।
আহার-নিদ্রা সব করেছি মাতৃউদরে—মাতৃরক্তের ধারা,
রক্তে রক্তে ছিল এক বন্ধনের গভীরতা,
শুধু ধ্বনি—হৃদস্পন্দনের নীরব স্নেহছোঁয়ায়।

সপ্তাহ গেছে, মাস পেরোয়,
চলতে থাকে গড়ে ওঠার নিখুঁত কারিগরি,
একটি হৃদয়, দুটি চোখ, একজোড়া পা—
মায়ের প্রেমে ভিজে ওঠে প্রতিটি অস্থি-মজ্জা—
তিলে তিলে নিয়েছি রূপ মনুষ্যসজ্জা।

হৃদয় খোঁজে প্রথম অনুভবের স্পন্দন—
কোনো ভাষা নেই, তবু কথা চলে, হয় বন্ধন।

মায়ের বুকের শব্দে মেশে অনন্ত উষ্ণতা,
শুধু এক ধ্বনি—হৃদয়ের মৌনতা!
আহার তারই রক্তের ঝরনা,
নিদ্রা মাখে দেহে শিশিরের নরম ঘ্রাণ।
ন’মাস ধরে গড়েছি এক গোপন পৃথিবী,
যেখানে মায়ের প্রেমই ছিল দিশারি।

প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি গেঁথে থাকি,
সে যদি বাঁচে, আমি ধীরে ধীরে হাঁটি।
অবশেষে আলো ঝলমলে ভোর,
ভাঙে গর্ভের গহন সুধানিধি।
প্রথম কান্নায় ছিঁড়ে ফেলি নীরবতার দ্বার—
মা! আমি এলাম, প্রথম উচ্চারণে জীবনে তোমার।

জন্ম না নিয়েই জীবন ছিল শুরু,
অন্তর্গত সেই চলনে ছিল অপার গুরু।
অঙ্গগুলি যখন রাখলুম বিশ্বমন্ডলে,
তখনই বুঝলুম আমি—এই আমি মনুষ্য!

শ্বাস ফেলি, দেখি আলো, শুনি শব্দের ঢেউ,
এ তো বিস্ময়ের নৌকায় বয়ে এল কেউ।
আজ হাঁটি, বলি, ভালোবাসি, ঘৃণা করি,
তবু সেই প্রথম দিনটিকেই পরিচয় কড়া নাড়ে।
মানুষ হওয়া শুধু জন্মের রূপ নয়—
জীবনের পাঠে সে রূপই আবার নিত্যনতুন হয়।