ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

‘দুঃখিত স্যার, আজ আপনাকে হারাতে চাই’—গুরুকে শিষ্যের হঙ্কার

৯ বছর আগে মাদ্রিদের এক শহরতলির ক্লাসরুমে যিনি ব্ল্যাকবোর্ডে চক-ডাস্টার নিয়ে কোচিংয়ের পাঠ দিচ্ছিলেন, তিনি লুইস দে লা ফুয়েন্তে। আর প্রথম বেঞ্চে বসে গভীর মনোযোগে শিক্ষকের প্রতিটি কথা টুকে নেওয়া সেই বিনীত ছাত্রটির নাম লিওনেল স্কালোনি। আজ মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক ফাইনালে সেই শিক্ষক আর ছাত্রই মুখোমুখি—একে অপরকে ছাড়িয়ে বিশ্বজয়ের নেশায়।

ফুটবল বিশ্ব যখন লিওনেল মেসি আর লামিন ইয়ামালের জাদুর অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে আছে, তখন ডাগআউটের আবহটা একদম ভিন্ন। সেখানে আজ কোনো শত্রুতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত মায়াবী রসায়ন। স্পেনের ডাগআউটে ৬৫ বছর বয়সী ‘গুরু’ লুইস দে লা ফুয়েন্তে; আর ঠিক উল্টোদিকে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে তাঁরই এক সময়ের ‘প্রিয় ছাত্র’, ৪৮ বছরের লিওনেল স্কালোনি। বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল রূপ নিয়েছে গুরু-শিষ্যের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে।

পেছনে ফিরে তাকালে বিশ্বাস করা কঠিন হতে পারে। ২০১৭ সালের শেষদিকের কথা। বুটজোড়া তুলে রেখে সদ্য সাবেক হওয়া ফুটবলার লিওনেল স্কালোনি তখন কোচিং লাইসেন্সের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের মাদ্রিদের ‘লা রোজাস’ ট্রেনিং সেন্টারে প্রফেশনাল লাইসেন্সের কোর্সে ভর্তি হলেন তিনি। সেখানে তাঁর শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুমে এলেন দে লা ফুয়েন্তে।

২০১৮ সালের আগস্টে—কে জানত, সেই ক্লাসরুমের পাঠ শেষ করার এক বছরের মাথায় স্কালোনি আর্জেন্টিনার অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পাবেন? আর কে-ই বা জানত, ক্লাসরুমের সেই শিক্ষা দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দেবেন ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা আর ২০২২-এর অমর বিশ্বকাপ!

২০২২ সালের ডিসেম্বরে স্পেনের দায়িত্ব নিয়ে দে লা ফুয়েন্তেও ফিরিয়ে এনেছেন ‘লা রোজা’দের চেনা ছন্দ। ২০২৪ ইউরো জয় আর নেশনস লিগের ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে যেভাবে তিনি স্তব্ধ করেছেন, তা ছিল এক নিখুঁত মাস্টারক্লাস।

ফাইনালের এই মহামঞ্চে এসেও দুজনের কণ্ঠে একে অপরের প্রতি ঝরে পড়ল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

গুরুকে নিয়ে আবেগাপ্লুত স্কালোনি বলেন, ‘তিনি আমার মেন্টর ছিলেন। আমি যা জানি, তাঁর সবকিছুই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আর আজ আমরা ফাইনালে মুখোমুখি! কাতার বিশ্বকাপের পর যখন কোচদের কনফারেন্সে আমাদের দেখা হলো, আমরা দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছি। তিনি স্পেনের সঙ্গে যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আকাশসম।’

ব্যক্তিগত জীবনে স্কালোনির সঙ্গে স্পেনের নাড়ির টান ভীষণ গভীর। ক্যারিয়ারের সোনালী সময় সেখানে কেটেছে, স্ত্রী এলিজা মনতেরো স্প্যানিশ, দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারও পাতেননি মায়োর্কাতে। কিন্তু আজ যখন প্রশ্নটি বিশ্বজয়ের, তখন গুরুর প্রতি ভালোবাসা কিছুটা আড়ালে রেখে আলবিসেলেস্তেদের হেডমাস্টার হেসে বললেন, ‘সবাই জানে স্পেনে আমার পরিবার। তবে আমি খুবই দুঃখিত, আজ আমি মিস্টার দে লা ফুয়েন্তেকে হারাতে মাঠে নামব।’

প্রিয় ছাত্রের এমন হুঙ্কারে যেন গর্বে বুক ভরে উঠছে শিক্ষক দে লা ফুয়েন্তের। স্কালোনিকে একজন ‘আদর্শ ছাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে স্প্যানিশ বস বলেন, ‘লিওনেলের (স্কালোনি) প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। সে আর্জেন্টিনার হয়ে সবকিছু জিতেছে। শিক্ষক হিসেবে ও ছিল আমার অত্যন্ত বাধ্য ও পরিশ্রমী ছাত্র। ক্লাসে ওর শেখার আগ্রহ আর মনোযোগ দেখেই বুঝেছিলাম—ও অনেক দূর যাবে। ওর শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য গর্বের।’

গর্বের জায়গাটা অবশ্য দে লা ফুয়েন্তের শুধু পেশাদারি সম্পর্কের কারণে নয়, বরং তারচেয়েও বেশি বন্ধুত্বের। ফুয়েন্তে যোগ করেন, ‘সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি ওর একজন বন্ধু। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সম্পর্কটা দারুণ।’

সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে আজ যখন ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের লড়াই চলবে, তখন একদিকে থাকবে দে লা ফুয়েন্তের শেখানো জ্যামিতিক ফুটবল, আর অন্যদিকে থাকবে সেই শিক্ষা নিয়েই বিশ্বজয় করা স্কালোনির ইস্পাতদৃঢ় দেওয়াল। ক্লাসরুমের সেই মাস্টার আর অ্যাপ্রেন্টিসের এই লড়াইয়ে দিনশেষে হাসবেন কে—গুরু নাকি শিষ্য? সেই উত্তর কিছু সময় পরই মিলবে।