ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঢাকা সিটি কলেজের ১৯৮ শিক্ষকের ১০৫ জনের নিয়োগই অবৈধ!

রাজধানীর ধানমন্ডির ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে কর্মরত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সরকারি আইন, বিধিমালা ও বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।

একই সঙ্গে গত নয় বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবে পাওয়া গেছে গুরুতর অসঙ্গতি। ব্যাংকিং বিধি ভেঙে নগদে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয়, ভ্যাট ও উৎসে আয়কর বাবদ ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে গভর্নিং বডির সদস্যদের এক কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সম্মানী দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ডিআইএ এসব অনিয়মকে আর্থিক বিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি প্রস্তুত করা এ প্রতিবেদন পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

১০৫ শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ জালিয়াতি

অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ২৮৮ জন। এর মধ্যে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৯৮টি, যার মধ্যে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই অনুমোদিত শিক্ষকদের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিআইএ অনূর্ধ্ব অডিট প্রতিবেদনে ধানমন্ডির ঢাকা সিটি কলেজের ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগকেই অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি আইন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে, মাউশি বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তি বা সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়নি।

ডিআইএ জানিয়েছে, প্রথম ১০০ জন শিক্ষকের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। যদিও নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, তবে নিয়োগ কমিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এছাড়া, পৃথক নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির বৈধ অনুমোদনের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণও পরিদর্শন দলের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে, বাকি পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়ম আরও গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং তিনজন সহকারী অধ্যাপক। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি, নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয়নি এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে শিক্ষা আইন ও সরকারি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের কারণে এসব নিয়োগকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিআইএ।

নীতিমালা উপেক্ষা করে পদোন্নতি ও বেতন

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে কলেজটিতে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। তাদের চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত ‘স্টাফিং প্যাটার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডিআইএ।

নগদ ব্যয়ে ‘সাময়িক আত্মসাৎ’ ও রাজস্ব ফাঁকি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবরক্ষণ নির্দেশিকার ৯ (গ) অনুচ্ছেদ এবং বেসরকারি মাধ্যমিক গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধানমালা, ২০০৯-এর ৪৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব অর্থ নির্ধারিত তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে এবং সব ব্যয় ক্রস চেকের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ হাতে রেখে ব্যয় করার সুযোগ নেই।

কিন্তু অডিটে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত টানা নয় বছরে ঢাকা সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার না করে নগদ অর্থ থেকেই ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় করেছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী, নগদ আদায় করা অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে হাতে রেখে ব্যয় করাকে ‘সাময়িক আত্মসাৎ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজটিতে গত নয় বছরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। গভর্নিং বডির সদস্যরা নিয়মবহির্ভূতভাবে পৌনে দুই কোটি টাকা সম্মানী গ্রহণ করেছেন। এছাড়া, ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন করে নগদে ৭২ লাখ টাকা ব্যয় এবং ভ্যাট-আয়কর বাবদ ৩১ লাখ টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ডিআইএ এই আত্মসাৎকৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরতের নির্দেশ দিয়েছে
তদন্তে গভর্নিং বডির আর্থিক অনিয়মেরও বড় চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরিদর্শনের সময় পর্যন্ত গভর্নিং বডির সদস্যরা ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ বা সম্মানী হিসেবে মোট এক কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা গ্রহণ করেছেন। ডিআইএ বলেছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের এ ধরনের সম্মানী গ্রহণের কোনো বিধান নেই। ফলে এই অর্থ গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি ও বিধিবহির্ভূত। প্রতিবেদনে পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, কলেজটির বিভিন্ন কেনাকাটা, নির্মাণকাজ, আপ্যায়ন, বিজ্ঞাপন, ছাপা ও খেলাধুলা সংক্রান্ত ব্যয়ের ওপর প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট কর্তন করা হয়নি। ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট না কেটে সরকারকে ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে পাবলিক পরীক্ষার সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুযায়ী উৎসে আয়কর কেটে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এ খাতে একই সময়ে ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকার আয়করও জমা দেওয়া হয়নি। সবমিলিয়ে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ফাঁকি দেওয়া ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৭৫৯ টাকা এবং গভর্নিং বডির নেওয়া এক কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তার চালানের অনুলিপি মন্ত্রণালয়ে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে কলেজটির ভৌত অবকাঠামো ও প্রশাসনিক অবস্থারও বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কলেজটিতে শিক্ষার্থী রয়েছেন ১০ হাজার ৮১১ জন। প্রায় ৩৯৪ দশমিক ০৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে ১৮০টি শ্রেণিকক্ষ। তবে, পরিদর্শনের সময় কলেজ কর্তৃপক্ষ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথি ও একাডেমিক হিসাব পরিদর্শন দলের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে কলেজটির বিরুদ্ধে চলমান একাধিক আইনি জটিলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত রিট পিটিশন (মামলা নং-৪৭২/২০১৩), ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির মামলা (মামলা নং-১৯/২৫৮-২০১৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার জালিয়াতি মামলা (মামলা নং-১৩২৫২/২০১৩) এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলা (মামলা নং-০৭/১৮৫-২০১২ ও ০৬/১৮৪-২০১২)। তবে, এসব মামলা পরিচালনায় কলেজের তহবিল থেকে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার কোনো হিসাব বা প্রমাণকও অডিট দলকে দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

অডিট প্রতিবেদনে ঢাকা সিটি কলেজের নিয়োগ ও আর্থিক পরিচালনায় যেসব ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, তা সরকারি আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি আইন অমান্য করে কোনো প্রতিষ্ঠানই চলতে পারে না।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান কলেজটি পরিদর্শন করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ঢাকা সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন ও রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণকসহ ‘ব্রডশিট’ আকারে জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে: ডিআইএ পরিচালক

বিষয়টি নিয়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন বজায় রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য। অডিট প্রতিবেদনে ঢাকা সিটি কলেজের নিয়োগ ও আর্থিক পরিচালনায় যেসব ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, তা সরকারি আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি আইন অমান্য করে কোনো প্রতিষ্ঠানই চলতে পারে না। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি টাকার সঠিক হিসাব ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা আবশ্যক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদনের ব্রডশিট জবাবের জন্য ১৫ কার্যদিবস সময় দিয়েছি। জবাব ও প্রমাণক পর্যালোচনার পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’