ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬,৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শেরপুরে বিকল্প জ্বালানিতে আশার আলো দেখাচ্ছে বায়োগ্যাস প্লান্ট

শেরপুরে সাশ্রয়ী ও বিকল্প জ্বালানিতে আশার আলো দেখাচ্ছে বায়োগ্যাস প্লান্ট। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গবাদি পশু ও পোল্ট্রি মুরগির ফার্ম। এসব গবাদি পশু গোবর এবং বিষ্ঠা থেকে উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয বায়োাগ্যাস প্লন্টের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চাকাও চাঙ্গা করতে পারে। সেই সাথে জ্বালানির বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বায়ো গ্যাস প্লান্ট। সীমন্ত জেলা শেরপুরে প্রাকৃতিক ও সিলিন্ডার গ্যাস এবং কাঠ বা লাকড়ি ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব বায়ো গ্যাস উৎপন্ন করে বাড়িতে এবং হোটেলের রান্নার কাজ চালাচ্ছে শতাধিক পরিবার।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আওতায় ইমপেক্ট প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যাযে ইতিমধ্যে শেরপুর জেলায় ৮০ টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হয়েছে।

এই প্রকল্পের অধীনে পরবর্তীতে দেশের ৬৪ জেলায় প্রতিটিতে ১ হাজার করে মোট ৬৪ হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা প্রদান করা হবে। যুব উন্নয়ন বায়োগ্যাস প্রকল্প প্রকল্পের প্রধান দিকসমূহ বা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো-গ্রামীণ এলাকায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন, রান্নার জন্য পরিবেশবান্ধব গ্যাস উৎপাদন এবং পচনশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানো। এছাড়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার জনের কর্মসংস্থান (প্রতি খামারে ন্যূনতম দুইজন) এবং ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সুবিধা হলো- এই প্লান্টের মাধ্যমে গৃহস্থালির বর্জ্য বা গোবর ব্যবহার করে রান্না এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। একই সাথে এ বায়োগ্যাসের বর্জ্য থেকে উন্নত জৈব সারও উৎপাদন করা যাবে। গ্রামীণ যুবকরা প্রকল্পের অধীনে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের সুবিধাও রয়েছে।

সূত্র জানায়, কমপক্ষে তিন থেকে চারটি গরু গোবর দিয়ে একটি চুলা ব্যবহারের জন্য বায়োাগ্যাস প্লান্ট বসানো যায় এবং এই প্লান্ট নূন্যতম ৪৫ বছর পর্যন্ত নন স্টপ চলমান থাকে। তবে প্লান্টে নিয়মিত গোবর বা বিষ্ঠা সরবরাহ থাকতে হবে। ন্যূনতম প্রতিটি প্লান্ট তৈরিতে মাত্র ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে বড় আকারে করলে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এই প্লান্ট তৈরির ডিজাইন ও নকশা সরবরাহ করা হয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট প্রকৌশলীদের দ্বারা।

ইতিমধ্যে জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী গ্রামে ৩০ টি বায়োগ্যাস প্লান্ট বসিয়ে বায়ো গ্যাস পল্লী ঘোষনা করা হয়েছে। তবে বর্তমানে বায়োগ্যাস পল্লীর ২০ টি প্লান্ট বসানোর কাজ চলমান রয়েছে বলে সূত্র জানায়। চলতি বছরের মধ্যে ওই গ্রাম পরিপূর্ণ বায়োগ্যাস পল্লী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে বলে সূত্র জানায়।

জেলার নকলা উপজেলার পৌর এলাকার ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ৩২ টি গরু নিয়ে একটি ডেইরি ফার্ম দিয়েছেন। ফার্মের ২২ টি গরুর গাভীর মধ্যে প্রতিদিন ১৮ টি গাভী ২২৮ লিটার দুধ দেয়। ওই ডেইরি ফার্মের গোবর দিয়ে তিন মাস আগে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে বিশাল বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে ৬০০ সিএফটি ধারন ক্ষমতার ওই প্লান্ট থেকে উৎপাদিত গ্যাস নিজে এবং তার আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও আশপাশের দশটা বাড়ি ও চায়ের দোকানের চুলায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব চুলা থেকে প্রতিমাসে সে সাড়ে দশ হাজার টাকা আয় করছে। এছাড়া যুব উন্নয়ন থেকে এই প্লান্ট নির্মাণ বাবদ সাড়ে তিন লাখ টাকা স্বল্প সুদে ঋণও পেয়েছেন তিনি।

নকলা পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা তাজিমুল ইসলাম জানায়, তার বাড়িতে সাতটি গরু নিয়ে খামার তৈরি করেছেন। আর এই খামার থেকে গোবর দিয়ে ২০০ সিএফটির ধারণ ক্ষমতা বায়োগ্যাস প্লান্ট করেছেন। এই প্লান্ট থেকে উৎপাদিত গ্যাস তার নিজের জন্য দুটি চুলায় ব্যবহার করছে। তবে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে গরুর সংখ্যা বাড়িয়ে গ্যাস প্লান্টের ধারণক্ষমতা বাড়াবে।
এদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের শালচূড়া নুনখোলা গ্রামের আলহাজ্ব আবু সালেহ ৫ একর জমির উপর ২০০৩ সালে একটি লেয়ার মুরগির ফার্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তিনি ইউটিউব দেখে একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করেন এবং প্রাথমিকভাবে ওই বায়োগ্যাস তিনি তার পরিবারের জন্য ব্যবহার শুরু করে। এরপর পর্যায়াক্রমে তিনি বাণিজ্যিক ভাবে বায়োগ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে সর্বশেষ আটটি বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করেছেন। বর্তমানে ওই প্লান্ট থেকে আশপাশের ২-৩ কিলোমিটার দূরত্বের বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁ এবং বাসা-বাড়িতে ১৫ টি লাইন সংযোগ দিয়েছেন। যা থেকে তিনি মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেছেন। এ বায়োগ্যাস প্লান্টের বিষয়ে যুব উন্নয়ন থেকে ঋণ না নিলেও যুব উন্নয়ন থেকে প্লান্টের তাদারকি ও খোজ খবর নিয়ে থাকে বলে জেলা যুব উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছে।

এ বিষয়ে ঝিনাইগাতি উপজেলার স্বত্বাধিকারী জুনায়েদ পল্ট্রি এন্ড ফিড এর সত্বাধিকারি আলহাজ্ব আবু সালেহ বলেন, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে তার বাড়ি থেকে প্রায তিন কিলোমিটার দূরে ঝিনাইগাতি উপজেলা সদরে শতাধিক চুলায় গ্যাসের সংযোগ দিবেন। এতে তার মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তার আটটি বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরিতে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এই প্লান্টগুলো থেকে একশরও বেশি চুলায় সংযোগ দিতে পারবেন বলে তিনি জানায়। এছাড়া তার বায়োগ্যাস প্লান্টের বর্জ উন্নতমানের সার হিসেবে স্থানীয় কৃষকরা নিয়ে যায়।

এদিকে নকলা উপলোর বায়োগ্যাস প্লান্টের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ফার্মে আরো গরু বৃদ্ধি করা হবে এবং এখান থেকে আরও বেশি গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমার কাছ থেকে যারা গ্যাস সংযোগ দিয়েছে তারা স্বল্প মূল্যে এবং অধিক তাপ সম্পন্ন গ্যাস পাচ্ছে বলে তারা জানিয়েছন।

এবিষয়ে রফিকুলের কাছ থেকে গ্যাস নেওয়া চায়ের দোকানদার শাহিন জানান, আমার এই চায়ের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করলে মাসে তিনটি সিলিন্ডার লাগতো। এতে খরচ হতো প্রায় ৫ হাজার টাকা। রফিকুল ভাইয়ের বায়োগ্যাস সংযোগ নিয়ে মাসে দিচ্ছি মাত্র তিন হাজার টাকা। এই গ্যাস রান্নার কাজ করতে পারছি কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই এবং সাশ্রয়ি মুল্যে।

একই এলাকায় বাসায় গ্যাস ব্যবহারকারী শিউলি, তারা মিয়া ও শফিক জানায়, লাকড়ির চুলায় ধোয়ার কষ্ট এবং সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য বেশি তাই এই বায়োগ্যাস আমাদের অনেক উপকার করেছে। এছাড়া এই গ্যাস সাশ্রয়ি, পরিবেশ বান্ধব ও নিরাপদ।
ঝিনাইগাতি উপজেলার সীমান্তবর্তী রাংটিয়া মোড়ে হোটেল মালিক মমিন মিয়া ও শামীম এবং শালচুড়া বাজারের চা দোকানী জয়নাল জানায়, পাহাড়ের লাকড়ির দাম অনেক বেশী এছাড়া পরিবেশবান্ধব এ চুলায় রান্না করলে কাস্টমারও ধোয়ামুক্ত থেকে খাবার খেতে পারে। তাই আমরা সালেহ ভাইয়ের এ বায়োগ্যাস ব্যবহার করছি।

এ বিষয়ে প্রকল্পের ক্রেডিট এন্ড মার্কেটিং অফিসার মাহমুদা পারভিন জানান, দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি নির্ভর সম্পদ সম্প্রসারণ এর লক্ষ্যে ইমপেক্ট প্রকল্পের আওতায় যাদের তিনের অধিক গরু আছে তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্লাান্ট স্থাপনের উদ্বুদ্ধ এবং উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে প্লান্ট স্থাপনের সময় তাদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়।

জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শেরপুর জেলায় ইমপেক্ট প্রকল্পে আওতায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৯০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০টি। ইতিমধ্যে ৬৯টি প্লান্ট স্থাপন শেষে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকিগুলো প্লান্ট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। যারা ইতিমধ্যে প্লান্ট স্থাপন করেছেন তাদের মাঝে ৭৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে । তবে এই প্লান্টের ব্যপারে আমার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সার্বিক দিক নির্দেশনা ও সহযোগীতা করায় এর সফলতা দেখতে পারছি। এই বায়োগ্যাস প্লান্ট ইতোমধ্যে গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পড়েছে এবং আগামী দিনে দেশে বিকল্প জ্বালানি শক্তি হিসেবে আশার আলো দেখাচ্ছে।