ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬,৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডিন কান্ডে’ বিতর্ক

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। কেউ গ্রহণ করেছে ; আবার কেউ নিয়মবহির্ভূত অ্যাখা দিয়ে পদত্যাগ করেছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন নিয়োগ দিয়েছে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। এ যেন মরা পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে উৎসব করার মতো অবস্থা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬ এর ২২(৫) ধারা অনুযায়ী, উপাচার্য সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে প্রতিটি অনুষদের বিভাগসমূহের অধ্যাপকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতা ও পর্যায়ক্রমিক রোটেশনের ভিত্তিতে দুই বছরের জন্য ডিন নিয়োগ দেবেন। তবে একই ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদে ডিন পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

আইনে আরও উল্লেখ রয়েছে, কোনো বিভাগে অধ্যাপক না থাকলে সেক্ষেত্রে ওই বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক ডিন হওয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া কোনো বিভাগের একজন অধ্যাপক ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে পরবর্তী রোটেশনে ওই বিভাগের অন্য অধ্যাপকরা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র মতে, গত ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১তম সিন্ডিকেট সভায় পাঁচজনকে বিভিন্ন অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন— বিজ্ঞান অনুষদে ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. প্রদীপ দেবনাথ, কলা ও মানবিক অনুষদে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. বনানী বিশ্বাস, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আহসান উল্লাহ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন এবং প্রকৌশল অনুষদে আইসিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুর রহমান। এছাড়া পরবর্তীতে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আইন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলী।

গত ১৩ মার্চ ডিনদের মেয়াদ শেষ হলেও উপাচার্য তাদেরকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলেন।

এদিকে ৪ মাস পর গত ৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯ তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জন অধ্যাপকদের আইনি মতামত না আসা পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন দায়িত্ব পালনের কথা বলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তবে নিয়োগ নিয়মবহির্ভূত অ্যাখ্যা দিয়ে দায়িত্ব গ্রহন করবেন না বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল ও ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম।

কেন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আমাকে আহ্বায়ক করে একটা কমিটি গ্রহণ করা হয়। আমি কমিটির রিপোর্টও জমা দিয়েছিলাম। এটা সিন্ডিকেটের এজেন্ডাও ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সদস্য মতামত দেন যে আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিয়ে রেজিষ্ট্রার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেয়। আমি রেজিষ্ট্রারের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্যারকে কল দেন। আমি উপাচার্যকে কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেন নাই, পুনরায় কল ব্যাকও করে নাই। রেজিষ্ট্রারের কাছে কিসের ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন তিনি (উপাচার্য) একক ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে যেহেতু কোন নিয়ম মানা হয় নাই তাই আমি এ পদ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক না।

একই দাবি করেন ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম, তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ডিন নিয়োগের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং অফিস আদেশে নিয়োগের আইনগত ভিত্তিও স্পষ্ট করা হয়নি।

তবে বিধি বহির্ভূত দাবি করে এরা দায়িত্ব না নিলেও অন্যরা নিয়ম মেনেই দায়িত্ব গ্রহন করেছেন।

এ বিষয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অন্তর্বর্তীকালীন ডিন অধ্যাপক ড. শেখ মকছেদুর রহমান বলেন, “আমাকে যেহেতু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি মনে করি কর্তৃপক্ষ বিধিবিধান মেনেই দায়িত্ব দিয়েছে। তারপরও আইনগত কোনো জটিলতা রয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের জন্যই আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হয়েছে।”

কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম কেন নিয়োগটিকে বিধিবহির্ভূত বলেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তিনি আমার সহকর্মী এবং ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কোন ব্যাখ্যায় বিষয়টিকে দেখছেন, সেটি আমার জানা নেই। উনার ক্ষেত্রে এটি বিধিসম্মত হয়েছে কি হয়নি, সেটা উনিই ভালো বুঝবেন। তবে আমাকে যেহেতু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি এটিকে বিধিসম্মত বলেই মনে করি।”

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ১৩ মে একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬ (সংশোধিত আইন-২০১৩) অনুযায়ী বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল, বিজনেস স্টাডিজ ও আইন অনুষদের ডিনদের মেয়াদ গত ১৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে শেষ হয়। এরপর পূর্বে দায়িত্বে থাকা ডিনদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী ডিন নিয়োগের বিষয়টি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণে গত ৭ মে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৯তম সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপন করা হয়। সভায় একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর পরামর্শক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুসারে একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর কাছে মতামত চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞের মতামত না আসা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য গত ১১ মে ছয়জন অধ্যাপককে বিভিন্ন অনুষদের ডিনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা ১২ মে থেকে কার্যকর হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞের মতামত আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে দুই বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিন নিয়োগ দেওয়া হবে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

সিন্ডিকেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিনরা হলেন, আইন অনুষদে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল, কলা ও মানবিক অনুষদে অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম, বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক ড. মো. শামীমুল ইসলাম, প্রকৌশল অনুষদে অধ্যাপক ড. মো. তৌফায়েল আহমেদ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে অধ্যাপক ড. শেখ মকছেদুর রহমান। তবে কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন হিসেবে শরিফুল করিম দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করায় নতুন ডিন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জি. এম. মনিরুজ্জামান।

এদিকে ডিন নিয়োগ বিধি বহির্ভূত দাবি করে নিন্দা জানিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। ১২ মে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক সমিতি অভিযোগ করে, বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও চেম্বার জজ আদালতের স্থায়ী স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল, বিজনেস স্টাডিজ ও আইন অনুষদে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা “আদালত অবমাননার শামিল”। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এতদিন অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোর মধ্যে পালাক্রমে ডিন নিয়োগের প্রচলন থাকলেও এবার সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার ও সদস্য-সচিব ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের পদোন্নতি বোর্ড সম্পন্ন না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় তড়িঘড়ি করে সিন্ডিকেট সভা আয়োজন করায় শিক্ষক সমিতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন বলেন,
“ঢাকায় সিন্ডিকেটে ডিন নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলাকালে আমরা উপাচার্যকে বলেছিলাম, আইন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি তোলা হোক। কিন্তু পরে ভিসি স্যার কুমিল্লায় এসে নিজ ক্ষমতাবলে ডিনের দায়িত্ব প্রদান করেন। অথচ এ ধরনের কোনো জরুরি প্রেক্ষাপট ছিল না যে তাৎক্ষণিকভাবে ডিন নিয়োগ দিতেই হবে। এখানে রোটেশন মানা হয়নি, বিভাগীয় জ্যেষ্ঠতাও অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণেই শিক্ষক সমিতি এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।”

ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী কয়েকজন শিক্ষক এটিকে বিধিসম্মত বলে দাবি করেছেন— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“যারা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারা স্বাভাবিকভাবেই বেনিফিশিয়ারি। তাই তারা এ ধরনের বক্তব্য দিতেই পারেন। তবে আইনের ব্যাখ্যার বিষয়ে তারা হয়তো বলবেন, ভিসি স্যার তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। সে বিষয়ে শিক্ষক সমিতির কোনো বক্তব্য নেই। আমাদের বক্তব্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলেই শিক্ষক সমিতি এর প্রতিবাদ করেছে।”

তিনি আরও বলেন,
“আমরা মনে করি, ভিসি স্যার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশেষ ব্যক্তিদের ডিন পদ দেওয়ার জন্যই এ কাজ করেছেন।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক অধ্যাপক মো. হায়দার আলী বলেন, ডিনদের এ দায়িত্ব স্থায়ী নয়, বরং সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব হিসেবে দেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইন বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গভাবে ডিন নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন সাময়িকভাবে দায়িত্ব প্রদান করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হয়েছে।