তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের মধ্যে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা। সারা দেশে এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। ঢাকায় কম হলেও বাইরের জেলাগুলোতে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকায় প্রস্তুতি ও পরীক্ষা আয়োজন ঘিরে উদ্বেগে আছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কমে গেছে। ফলে জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও এরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ।
এতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের হিসাবে সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা ১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩১ মেগাওয়াট, সে হিসাবে লোডশেডিং ছিল দুপুরেই ১ হাজার ২১৯ মেগাওয়াট। এদিকে রবিবার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পিক আওয়ার অর্থাৎ সন্ধ্যা সাতটায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৫১ মেগাওয়াট। এ তো গেলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব। অপরদিকে স্থানীয়ভাবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সূত্র জানায়, তাদের কেউই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিং করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দা রুপনা আহমেদ জানান, তার ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। দিনের বেলায় লোডশেডিং হলে পড়াশোনার ক্ষেত্রে তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। যদিও গরম এখন অনেক বেশি। কিন্তু সন্ধ্যার পরে যখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকছে না, তখন সবচেয়ে কষ্টকর। সবাই তো আর আইপিএস বা জেনারেটর ব্যবহার করতে পারে না। মোমবাতি হারিকেনের যুগেই ফিরে যেতে হচ্ছে মনে হয়। তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় গ্রামের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে এখন হারিকেন আর মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে গরম তো আছেই। বলা যায়, চরম ভোগান্তি নিয়েই এবার শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা।

রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার হজে যাওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা আব্দুল হালিম জানান, তাদের অধীন এলাকায় পিক আওয়ারে অর্থাৎ সন্ধ্যা সাতটায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ পান ৫৫ থেকে ৬০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট। তিনি জানান, সন্ধ্যায় এই পরিমাণ লোডশেডিং হলেও সকালের দিকে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা কম থাকে। ফলে খুব বেশি লোডশেডিং হচ্ছে না। অপরদিকে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ জানান, তার এলাকায় পিক আওয়ারে চাহিদা থাকে সাধারণত ১৭০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে বিদ্যুৎ পান ১২০ থেকে ১৩০ মেগাওয়াট। এ কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে মাইকিং করার নির্দেশনা দিয়েছে। কখন লোডশেডিং হবে, তা যাতে করে গ্রাহকরা আগেই জানতে পারে। পাশাপাশি গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে, এ সংখ্যা তিন লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী। সারা দেশে ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, এতে অংশ নেবে ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
সব মিলিয়ে তীব্র লোডশেডিং, গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের চাপের মধ্যেই শুরু হচ্ছে এবারের এসএসসি পরীক্ষা। একদিকে বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, অপরদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





