কিছুদিন ধরে একটি মামলা পরিচালনা করছি, যেখানে ভুক্তভোগী একজন মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্রাপ্ত বয়ষ্ক। স্বজন কতৃক তার সম্পত্তি ভোগ দখলের চেষ্ঠা চলছে বলে অভিযোগ করা হয়। আমাদের দেশে এমন ঘটনা হরহামেশাই আছে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডাওন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু জন্মায়। এসব শিশুরা যখন প্রাপ্ত বয়ষ্ক হয় তখন তাদের সম্পত্তি দখল ও জালিয়াতি এবং অভিবাকত্ব নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। আমাদের দেশে মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন না জানায় এসব বিষয়ে হয়রানি হতে হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ মোতাবেক মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যাক্তির অভিবাক হবে বাবা-মা। যদি দুজনের একজনও না থাকে তখন অন্যকোন স্বজন অভিবাবকত্ব লাভ করতে পারবে আদালতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। অভিবাবক ওই ব্যক্তির ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং তার সম্পত্তি দেখাশোনা করবেন। মানসিক স্বাস্থ্য আইন এর ধারা ২১ এ অভিবাকত্ব লাভের বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। আদালতের আদেশে অভিবাকত্ব লাভ করতে হলে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে।
অভিবাকত্ব লাভের জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হতে হবে যেমন: পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, অথবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়। এছাড়াও, আবেদনকারীর বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে এবং তার সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য থাকতে হবে। আবেদনকারীকে জেলা জজ আদালতে একটি লুনাটিক মিছ মামলা দায়ের করত হবে। এই মামলার করার মাধ্যমে মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিটি তার সম্পত্তি রক্ষণা-বেক্ষণে অক্ষম এই বিষযটি আইনত স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। আবেদনকারীকে নিজের পরিচয় এবং অভিভাবক হওয়ার জন্য তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।
এরপর আদালত আবেদনকারীর আবেদন এবং প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আবেদনকারীর বক্তব্য শুনার জন্য একটি শুনানির দিন ধার্য করবেন। এবং মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিকে যাচাই করে প্রয়োজনে অন্যান্য সাক্ষীদেরও জবানবন্দি গ্রহণ করবে।
আদালত যদি মনে করে যে আবেদনকারী উপযুক্ত এবং মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণের জন্য কাজ করতে সক্ষম, তবে আদালত আবেদনকারীকে অভিভাবক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করবে। আদালত আবেদনকারীকে একটি অভিভাবকত্ব সনদ প্রদান করবে, যা আবেদনকারীর জন্য একটি আইনি দলিল হিসাবে গণ্য হবে। অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তির ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। পরে কোনো কারণে যদি আদালত মনে করে যে অভিভাবক তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে, দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছে অথবা তার আচরণে মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষতি হচ্ছে, তবে আদালত অভিভাবকত্ব বাতিল করতে পারে।
মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তির সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য আইনের ২২ ধারায়।
কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে এতটাই অসুস্থ হন যে তিনি নিজের আর্থিক বিষয়, সম্পত্তি বা আইনি অধিকার সঠিকভাবে রক্ষা বা পরিচালনা করতে অক্ষম তখন তাঁর পরিবারের সদস্য, নিকট আত্মীয়, অভিভাবক বা সংশ্লিষ্ট যে কোনো ব্যক্তি জেলা জজ আদালতে আবেদন করতে পারেন।
আদালত যদি মনে করেন উক্ত ব্যাক্তি তার সম্পত্তি রক্ষনা-বেক্ষনে সক্ষম নন তখন উক্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থার চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করবেন।
প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ করবেন, এবং সবকিছু বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি রক্ষার্থে একজন অভিভাবক বা ব্যবস্থাপক নিয়োগের নির্দেশ দিতে পারেন।
ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মানসিক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন। তিনি আদালতের তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন এবং আদালতের নির্দেশ ছাড়া সম্পত্তি বিক্রয়, হস্তান্তর বা বন্ধক রাখতে পারবেন না।
এভাবে আইনটি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
আইনের উদ্দেশ্য
এই বিধান শুধু সম্পত্তি রক্ষার জন্য নয়, বরং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তির মর্যাদা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্যও প্রণীত। পূর্বে এমন ব্যক্তির সম্পত্তি নিয়ে স্বজন প্রভাবশালীরা অন্যায়ভাবে দখল করত। মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ এর ধারা ২২ এসব অনিয়ম ঠেকানোর জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ)
প্যানেল আইনজীবী: জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা









