ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,৩ বৈশাখ ১৪৩৩

সূরা আল-ইমরানের আলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা

“বলুন, হে আল্লাহ! আপনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন। আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনার হাতেই নিহিত। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”

সূরা আল-ইমরান-এর ২৬ নম্বর আয়াত কুরআনের সেই মৌলিক আয়াতগুলোর একটি, যা মানুষকে ক্ষমতা, ইতিহাস ও রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এই আয়াত আমাদের শেখায়—ক্ষমতা কোনো মানবসৃষ্ট সম্পদ নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের অর্জন নয়, কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের স্থায়ী সম্পত্তিও নয়। ক্ষমতার প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ।

এই ঘোষণা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলেও বাস্তবতা হলো—ইতিহাস বারবার এই আয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছে। মানুষ পরিকল্পনা করে, কৌশল আঁকে, শক্তি প্রদর্শন করে; কিন্তু কখন ক্ষমতা উঠবে, কখন নামবে—সেই সিদ্ধান্ত মানুষের হাতে নেই।

ইতিহাস ও তাকদির: ক্ষমতার চিরন্তন নিয়ম

ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, পৃথিবীতে কোনো শাসনব্যবস্থা চিরস্থায়ী হয়নি। ফেরাউন নিজেকে সর্বশক্তিমান মনে করেছিল, নমরুদ শক্তির দম্ভে অন্ধ হয়েছিল, রোমান সাম্রাজ্য নিজেকে অজেয় ভাবত। আধুনিক যুগেও বহু শাসক ও রাষ্ট্র নিজেদের ক্ষমতাকে স্থায়ী ধরে নিয়েছিল।

কিন্তু একসময় সবাই আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে অসহায় হয়েছে। ক্ষমতার উত্থান-পতন, শাসকের আবির্ভাব ও পতন, বিজয় ও পরাজয়—সবই আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমাহর অধীন পরিচালিত হয়। মানুষ কেবল দৃশ্যমান কারণ তৈরি করে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন আল্লাহ। এই বাস্তবতা অস্বীকার করলে মানুষ অহংকারে ডুবে যায়, আর সেই অহংকারই শেষ পর্যন্ত পতনের পথ তৈরি করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট: ক্ষমতার পালাবদলের পাঠ

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনকে দেখা প্রয়োজন। এটি কোনো একক গোষ্ঠীর বীরত্বগাথা নয়, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক কৌশলের চূড়ান্ত সাফল্যও নয়, কোনো তথাকথিত “ম্যাটিকিউলাস ডিজাইন”-এর অবধারিত ফলও নয়।

এটি ছিল আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত একটি ক্ষমতার পালাবদল। যদি গণঅভ্যুত্থান হয়ে থাকে, সেটিও আল্লাহর ইচ্ছার বাহক মাত্র। আল্লাহ মানুষকে ব্যবহার করেন, পরিস্থিতি তৈরি করেন, সমাজের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করেন—কিন্তু কর্তা হিসেবে থাকেন তিনিই। এই সত্য বুঝলে অহংকারের জায়গা থাকে না। বরং জায়গা থাকে আত্মসমালোচনা, সংযম ও ইবরতের। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে পরিবর্তনকে মানুষ নিজের কৃতিত্ব মনে করেছে, সেই পরিবর্তনই পরবর্তীতে তাদের জন্য পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

পরাজয় ও উপলব্ধি: আওয়ামী লীগের জন্য বার্তা

আওয়ামী লীগের জন্য এই পতন কেবল একটি রাজনৈতিক পরাজয় নয়। এটি একটি বড় উপলব্ধির সুযোগ। এই পতন কোনো “জঙ্গি শক্তি”, কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্র বা অদৃশ্য শত্রুর চক্রান্ত নয়। আল্লাহই ক্ষমতা দিয়েছেন, আবার আল্লাহই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে আত্মশুদ্ধির পথ বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাসে দেখা গেছে—যে দল বা শাসক নিজের পতনের কারণ খুঁজতে অস্বীকার করেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর সংকটে পড়েছে। ক্ষমতা যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তখন ক্ষমতা হারানোও আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে—এটি মেনে নেওয়াই ঈমানি পরিপক্বতার লক্ষণ।

ক্ষমতা প্রাপ্তির পরীক্ষা: যারা সামনে এসেছে

অন্যদিকে, যারা এই পরিবর্তনের সময়ে সামনে এসেছে, তাদের জন্যও এটি কোনো বিজয়োল্লাসের মুহূর্ত নয়। এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। ইতিহাস বলে—ক্ষমতা পাওয়া সহজ, কিন্তু ক্ষমতার হক আদায় করা কঠিন। যে ক্ষমতাকে মানুষ নিজের কৌশলের ফল মনে করে, সেই ক্ষমতাই একদিন তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সূরা আল-ইমরান (৩:২৬) এই অহংকার ভাঙার আয়াত।

ড. ইউনুস ও আমানতের ধারণা

ড. ইউনুস প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন—এই ঘটনাকেও একই আয়াতের আলোকে বিচার করা জরুরি। তিনি কারো ব্যক্তিগত নকশা, গোপন সমঝোতা বা নিখুঁত রাজনৈতিক পরিকল্পনার ফল নন। আল্লাহর ইচ্ছাতেই তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছেন। মানুষ কারণ হতে পারে, কিন্তু কর্তা নন। এই উপলব্ধি না থাকলে ক্ষমতা আমানত না হয়ে আত্মঅহংকারের উৎস হয়ে ওঠে। আর আমানতের সঙ্গে খেয়ানত হলে তার পরিণতি ইতিহাসে কখনোই সুখকর হয় না।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র: ইসলামের দৃষ্টিতে সংশোধন

আধুনিক গণতন্ত্র ভোটকে চূড়ান্ত শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলাম ভোটের গুরুত্ব অস্বীকার করে না, তবে সেটিকে সর্বশক্তিমানও বানায় না। সূরা আল-ইমরান (৩:২৬) আমাদের শেখায়—ভোট মাধ্যম, ক্ষমতা আল্লাহর সিদ্ধান্ত।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোট বনাম জামায়াত জোট—এই প্রতিযোগিতা যত তীব্রই হোক, শেষ কথা আল্লাহর হাতেই।

বাংলাদেশের সব ভোটার যদি এককভাবে কোনো একটি জোটকে ভোট দেন, কিন্তু আল্লাহ যদি তাদের জন্য ক্ষমতা নির্ধারণ না করেন—তাহলে ক্ষমতার দরজা খুলবে না। আবার মানুষের চোখে দুর্বল মনে হওয়া পক্ষও আল্লাহ চাইলে ক্ষমতায় আসতে পারে। এই বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল করে, কিন্তু উদ্ধত করে না।

নির্বাচনের পরের রাজনীতি: ঈমানি মানদণ্ড

সূরা আল-ইমরান (৩:২৬) অনুযায়ী, মেনে নেওয়ার বাস্তব পরীক্ষা আসে নির্বাচনের পর। বিজয়ে বিনয়—এটি ঈমানের সৌন্দর্য। পরাজয়ে ধৈর্য—এটি ঈমানের দৃঢ়তা।

২০২৬ সালের নির্বাচনে যে জোট জিতবে, তাদের বলা উচিত—এটি আল্লাহর অনুগ্রহ। যে জোট হারবে, তাদের বলা উচিত—এটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে “কারচুপি”র অভিযোগ তোলা কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়, বরং আল্লাহর তাকদিরের প্রতি অসন্তোষের প্রকাশ। অবশ্যই ন্যায়বিচারের পথ খোলা থাকবে—আইন, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু তাকদির অস্বীকার করে নয়।

ক্ষমতা, তাকওয়া ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

ক্ষমতা আল্লাহ দেন, আল্লাহ নেন। মানুষ পরিকল্পনা করে, কিন্তু পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে আল্লাহর পরিকল্পনা। রাজনীতি হবে, নির্বাচন হবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে—এটাই দুনিয়ার নিয়ম। কিন্তু শান্তি, স্থিতি ও কল্যাণ আসবে তখনই, যখন ব্যক্তি, দল ও রাষ্ট্র এই সত্য মেনে নেবে।

“সকল কল্যাণ আল্লাহর হাতেই নিহিত।”

এই বিশ্বাসই অহংকার ভাঙে, অবিচার রোধ করে এবং ক্ষমতাকে আমানতে রূপ দেয়। আর আমানতের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্রই টিকে থাকে—ইতিহাস তার সাক্ষী। ২০২৬ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল যাই আসুক না বিএনপি জোট ও জামায়াতের জোট এর উচিত তা মেন নেওয়া। সূরা আল-ইমরান (৩:২৬)–এর এই আয়াতকে মান‍্য করে মুমিন এর পরিচয় দেওয়া

“বলুন, হে আল্লাহ! আপনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেন। আপনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনার হাতেই নিহিত। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”