পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় “আতা বহুমুখী সমবায় সমিতি”-র আড়ালে বৃহৎ আকারের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে সমিতির মালিক উত্তম মিস্ত্রির বিরুদ্ধে। গ্রাহকদের শত কোটি টাকার আমানত আত্মসাতের অভিযোগ এনে বিক্ষোভে নেমেছেন ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘদিন ধরে টাকা ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা তার মালিকানাধীন জমি দখল করে অবস্থান নিয়েছেন এবং টাকা না পাওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে সরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
নেছারাবাদ উপজেলার পূর্ব জলাবাড়ী গ্রামের স্বামীহারা নারী অঞ্জলি রানী (৪০) দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় দেড় লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। মেয়েদের বিয়ের জন্য সঞ্চিত সেই টাকা দ্বিগুণ লাভের আশায় আতা বহুমুখী সমবায় সমিতিতে জমা রাখেন। কিন্তু এখন তিনি বিপদে।
অঞ্জলি রানী বলেন, “লাভ তো দূরের কথা, নিজের টাকাও ফেরত পাচ্ছি না। বারবার গেলে শুধু সময় দেয়, উল্টো অপমান করে।”
একইভাবে ছোট ব্যবসায়ী রিপন হালদার (৪২) ঘর নির্মাণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আশায় সাত লাখ টাকা জমা দেন। এখন তিনি দিশেহারা।
রিপনের অভিযোগ,“টাকা চাইতে গেলে নানা অজুহাত দেয়, কখনো হুমকিও দেয়। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।”
হাজারো মানুষের একই দুর্দশা
অঞ্জলি বা রিপনই নন; নিমাই, সুখরঞ্জন রিয়াজমৃধা সহ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত তিন বছর ধরে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করা হলেও অধিকাংশ গ্রাহকই তাদের টাকা ফেরত পাননি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, “সময় লাগবে” এই আশ্বাস দিয়ে বছরের পর বছর ঘুরানো হচ্ছে তাদের।
অভিযোগ রয়েছে, সমবায়ের লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংকিং কার্যক্রমের মতো আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে। দরিদ্র ও বেকার মানুষদের চাকরির প্রলোভন এবং দ্বিগুণ লাভের লোভ দেখিয়ে অন্তত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। চাকরির প্রলোভন, দ্বিগুণ লাভের ফাঁদ পেতেছে উত্তম মিস্ত্রি।
স্থানীয়দের দাবি, এই অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়—মাদ্রা, আতা, বরিশাল—এমনকি ভারতের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে জমি-বাড়ি গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া তিনটি লাইটার জাহাজ কেনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
কর্মচারীরাও বিপাকে
সমিতির সাবেক কর্মচারী মানিক লাল রায় জানান, তিনি আট বছর চাকরি করেছেন এবং শুধু আমানত সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতেন।
তিনি বলেন,“আমি একাই প্রায় তিন হাজার সদস্য সংগ্রহ করেছি। তাদের টাকা উত্তমকে দিয়েছি। এখন কেউ টাকা পাচ্ছে না, সবাই আমার কাছে আসে। পাওনাদারদের চাপে আমি নিজেও বিপদে আছি।”
বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, উত্তম মিস্ত্রি গা-ঢাকা দিয়েছেন এবং ভুক্তভোগীদের চাপ বাড়ায় গোপনে সম্পদ বিক্রি করছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে—যে কোনো সময় তিনি সব বিক্রি করে পালিয়ে যেতে পারেন।
তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
নেছারাবাদ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ রিয়াদ খান বলেন,
“উত্তমের সমিতির লাইসেন্স ঝুঁকিসহ বিভিন্ন অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে। অন্য কোনো সমিতি থাকলে তা আমাদের অনুমোদিত নয়।”
তবে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করে টাকা ফেরত না দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের করণীয় কী? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এখানে আমাদের কিছু করার নেই।”
জমি দখল করে অবস্থান টাকা ফেরতের দাবিতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা উত্তম মিস্ত্রির মালিকানাধীন জমি দখল করে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। তারা ঘোষণা দিয়েছেন,
“আমাদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এই জমি ছাড়ব না।”
স্থানীয়দের মতে, এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং যেকোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, সুষ্ঠু তদন্ত এবং তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহল মনে করছে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।








