ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,৩ বৈশাখ ১৪৩৩

কিশোর গ্যাং নেতা ‘এলেক্স ইমন’ খুনের চাঞ্চল্যকর রহস্য উদঘাটন

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত রোববার কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’–এর প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়।চাঞ্চল্যে ভরা ‘এলেক্স ইমন’ খুনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর রহস্য উদঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে, ছিনতাই হওয়া স্মার্টফোন নিয়ে অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে খুন হয় ইমন। খুনের আগে রোববার সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। খুনের পর ওই এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।

এ ঘটনায় ইমনের মা ফেরদৌসী বেগম বাদী হয়ে ২১ জনকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেছেন। খুনের পর থেকে জড়িতদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন ইউনিট।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রোববার ঘটনাস্থল থেকে মো. সাইফ (২৩), তুহিন (২০) ও মো. রাব্বী কাজী (২৫) আটক করা হয়। মামলা হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর গতকাল বিকেলে মো. সুমন (২৫) নামের আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আটক তিনজনের কাছ থেকে তিনটি চাপাতি, একটি কাটার, স্টিলের একটি পাত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনই আরমান–শাহরুখ গ্রুপের সদস্য।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনের শিকার ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেট–সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতো। ওই এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, নার্সারি থেকে চাঁদা তুলতো। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিল।

অপরদিকে, রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন আরমান–শাহরুখ নামের আরেকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা। দুই গ্রুপের সদস্যরাই আবার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ দুই সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আগে থেকেই এ দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই রোববার এ খুনের ঘটনা ঘটে।

ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রোববার সকালে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ইমন ও আরমান–শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোনের ভাগাভাগি নিয়েই এ মারামারি হয়। ধাওয়া খেয়ে ইমনসহ তার লোকজন রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি এলাকায় এলে তাঁদের মধ্যে আরেক দফা কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা ইমনদের ধাওয়া দিলে তারা রায়েরবাজার ঢালের ১ নম্বর গলির দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। সেখানেই ইমনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

পরে আহত ইমনকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটেজে দেখা গেছে, চাপাতি হাতে ইমনকে ধাওয়া করছেন প্রতিপক্ষ গ্রুপের ১০ থেকে ১৫ জন। একপর্যায়ে একটি বাসার সামনে পড়ে যায় সে। এরপর চারদিক ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে কোপানো হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইমনের বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একপর্যায়ে ইমনকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হয়।

পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত ১০ থেকে ১২ জনকে চিহ্নিত করেছে তারা। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান–সংলগ্ন এলাকায় অপরাধ কার্যক্রম চালালেও ইমন এ এলাকায় থাকতো না। মাঝেমধ্যে সেখানে আসতো। অপরাধ করে আবার ওই এলাকার বাইরে চলে যেতো। রোববার সকালে সাভার থেকে রায়েরবাজার আসে ইমন। এলাকায় আধিপত্য জানান দিতেই সে আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায়। প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা আরমান, শাহরুখও রায়েরবাজারের বাইরে থাকে।

পুলিশ বলছে, নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায়ই দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পরে একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিল। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। অন্যদিকে আরমান ও শাহরুখের নামেও এসব থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ইমন হোসেন মোহাম্মদপুরের বাইরে থাকতো, মাঝেমধ্যে এলাকায় আসতো এবং অপরাধ করে গা ঢাকা দিতো। পুলিশ অনেক দিন ধরেই তাকে খুঁজছিল। রোববার সকালে এলাকায় আসলে মোহাম্মদপুরের বাইরে এক দফা মারামারিতে জড়ায় সে। সেই ঘটনার রেশ ধরেই বিকেলে খুন হয় ইমন।