ঢাকা | বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,১১ ভাদ্র ১৪৩৩

ফ্যাসিস্ট আমলের দুর্বিষহ দিনের স্মৃতিচারন করে আবেঘন পোস্ট জবি ছাত্রদল নেতার

ফ্যাসিস্ট আমলে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট নিজের ষষ্ঠবার গ্রেপ্তার, ডিবি ও থানা হেফাজতে রিমান্ড, নির্যাতন এবং প্রায় দুই মাসের কারাবাসের দুর্বিষহ দিনের স্মৃতি মনে করে ফেসবুক পোস্ট করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রুমি। ২০২১ সালের ১৭ আগস্টের রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে গ্রেপ্তার, ডিবি হেফাজত, রিমান্ড, কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর কারাগারে অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পুরো ঘটনা নিজের ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

রোববার (২৩ আগস্ট ) দেওয়া ওই পোস্টের শুরুতে রুমি লেখেন, ‘৫ বছর আগে আজকের দিনে ২৩ আগস্ট-২০২১ ৬ষ্ঠ তম গ্রেফতার। ১ দিন ডিবি, ২ দিন থানা রিমান্ড এবং ৩টি মামলায় প্রায় দুই মাসের কারাবাসের দুঃসহ স্মৃতি।’

রুমি বলেন, ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির আমানউল্লাহ আমান ও আমিনুল হকের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তার দাবি, কর্মসূচি চলাকালে হঠাৎ পুলিশ বিনা উসকানিতে গুলিবর্ষণ ও হামলা চালায়। এরপর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

তিনি তার পোস্টে লেখেন, ‘দল ও দেশের প্রয়োজনে আমি কখনোই পিছু হটিনি, যখনই যেখানে প্রয়োজন হয়েছে কোনো কিছু চিন্তা না করেই রুখে দাঁড়িয়েছি, সংকটের শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই করেছি।’

রুমি বলেন, ওই ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘রেড এলার্ট’ জারি করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, ১৮ আগস্ট ২০২১ হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করতে গেলে সেখানেই ডিবি তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর প্রশাসনের বিভিন্ন টিম তাকে খুজতে থাকে।

রুমির বলেন, প্রায় সাত দিন পর ২৩ আগস্ট ২০২১ রাত ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকা থেকে সাইফ মাহমুদ জুয়েল, শেরাজুল ইসলামসহ তাকে ডিবি তুলে নিয়ে যায়।

পোস্টে রুমি আরও জানান, তাকে গুম করার পরিকল্পনা ছিল ডিবির। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সহযোদ্ধা, ছাত্রদল নেতাকর্মী, বিএনপির মহাসচিবের বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সাইফ মাহমুদ জুয়েল ও শেরাজুল ইসলাম তার সঙ্গে থাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রুমি ববলেন, রাতে ডিবি অফিসে অবস্থানের সময় ডিবির একজন কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছিলেন, তাকে গুম করার পরিকল্পনা ছিল। তবে সবকিছু মিলিয়ে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং ‘আল্লাহর অশেষ রহমতে’ তিনি বেচে যান বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পরও একদিন পর্যন্ত ডিবি বিষয়টি স্বীকার করেনি। পরে ডিবি অফিস থেকে তাদের আদালতে নেওয়া হয়।

আদালতে নেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয় বলে জানান রুমি। আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর রিমান্ডের জন্য তাকে থানায় নেওয়া হয়। এ সময় ডিসিসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাকে দেখতে থানায় গিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

রুমি আরও বলেন, ডিবি অফিসে এক দিন এবং থানায় দুই দিন রিমান্ডের নামে তাকে ‘অমানবিক নির্যাতন’ করা হয়। তার দাবি, তথ্য নেওয়ার জন্য যতবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, ততবারই বলা হয়েছে, ‘তোমার রিপোর্ট খুবই খারাপ।’ একই সঙ্গে তাকে বলা হতো, ‘যখনই ঝামেলা হয় তুমি সবসময় সামনে থেকে ঝামেলা করো, ভাঙচুর করো।’

থানায় রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনের শেষ রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রুমি দাবি করেন, ওই রাতে চোখ বেধে এবং হাত-পা বেধে তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। একই রিমান্ডে থাকা সাইফ মাহমুদ জুয়েল তার নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রুমির পোস্ট অনুযায়ী, ওই রাতে নির্যাতনের পর ব্যথায় তার কাপুনি দিয়ে জ্বর আসে। পরে তাকে ‘নাপা এক্সটেন্ড’ খাওয়ানো হয়। পরদিন সকালে আদালতে নেওয়ার সময় তিনি হাটতে পারছিলেন না বলে দাবি করেন। তখন আবারও তাকে ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো হয়।

এ সময় থানা ও আদালত গারদের পুলিশ তাকে আদালতে ওঠার সময় স্বাভাবিকভাবে হাটার জন্য বারবার বলেছিল বলেও জানান রুমি।

এরপর তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়। রুমি জানান, কেরানীগঞ্জ কারাগারে তিন দিন থাকার পর এক ভোরে দুইজন এসে ঘুম থেকে তুলে দ্রুত ব্যাগ গুছাতে বলেন। খোজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ‘শাস্তিস্বরূপ’ তাদের ‘রকেট চালান’ দেওয়া হয়েছে এবং মানিক কাশিমপুর জেলে পাঠানো হবে।

পরে তাকে কাশিমপুর-২ কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই মাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পান বলে জানান তিনি।

নিজের গ্রেপ্তার ও মামলার প্রসঙ্গে রুমি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ছয়বারের মধ্যে ২০২১ সালের ২৩ আগস্টের ঘটনাটি ছিল ষষ্ঠবার। প্রতিবারই কমবেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, ষষ্ঠবারের গ্রেপ্তারে নির্যাতনের ভয়াবহতা আগের সব অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

এরপরও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি বলে দাবি করেন রুমি। তিনি বলেন, দেশ ও জাতির মুক্তির সংগ্রাম থেকে এক বিন্দুও সরে যাননি এবং ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও প্রশাসনের সঙ্গে’ কোনো মুহূর্তে আপস করেননি।

জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসীদের প্রসঙ্গে রুমি তার পোস্টে লেখেন, ‘আমাদের জন্য জেল ছিলো বিশ্রামাগার আর রাজপথ ছিলো খেলার মাঠ।’ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও রাজপথে ফিরে এসে ‘হাসিনা তুই স্বৈরাচার’ স্লোগান ধরতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দীর্ঘ সময়ের ওই রাজনৈতিক দুঃসময়ের কথা তুলে ধরে রুমি বলেন, যারা সেই সময় বেচে আছেন তারা জানেন, এই পথ তাদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তার দাবি, মহান আল্লাহর রহমত, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ হয়েছে।

পোস্টের শেষদিকে দীর্ঘ দুঃসময়ে পাশে থাকা সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এই নেতা।