ঢাকা | মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,১০ ভাদ্র ১৪৩৩

‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগে ঢাবির ৫৮ শিক্ষকের নাম তালিকাভুক্ত

‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৯২ শিক্ষকের মধ্যে ৫৮ জনের নাম শনাক্ত করা হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতায় অভিযোগ আনা হয় এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তাদের শনাক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে আইনজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি গঠন ‘আইনের পরিপন্থি’।

তারা বলেন, কারও রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার করতে পারে না। ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতার’ অভিযোগে শিক্ষকদের তালিকা করার বিষয়টিকে প্রশাসনের ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

গত ১৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের গোপন তৎপরতা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষক গোপন তৎপরতায় লিপ্ত আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জন শিক্ষকের নাম শনাক্ত করা গেছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয়টি ‘খতিয়ে দেখে করণীয় নির্ধারণ’ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন এবং আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ইকরামুল হক।

আরও কারও নাম শনাক্ত করা গেলে তাদের বিষয়টিও এই কমিটি খতিয়ে দেখবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

কিভাবে এই শিক্ষকদের শনাক্ত করা হয়েছে—জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, আমরা কারও তালিকা করিনি। কারা করেছে, তাও আমি জানি না। উপাচার্য আমাদের একটি কমিটি করে দিয়েছেন। আমরা এখনো বসিনি।

উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে তালিকা প্রণয়নের ভিত্তি জানতে চাইলে বলেন, আমাদের কাছে এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) তথ্য চেয়েছে। তাদেরকে তথ্য দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আমরা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি মাত্র, আমরা নিজেরা তালিকা করিনি।

তালিকায় থাকা অন্তত তিন শিক্ষক দাবি করেছেন, তারা এ ধরনের কোনো তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত নন। তারা হলেন—শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান এবং অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত।

কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে নেই।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর ৫৬(৩), ১ম সংবিধির ৪৫(৩) এবং অর্ডিন্যান্স ও রেগুলেশন চ্যাপ্টার ২০-এর বিধি ১৩ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘অশিক্ষকসুলভ ও নৈতিক স্খলনজনিত’ অপরাধ।

কর্তৃপক্ষের দাবি, বিধি ১৩(২) অনুযায়ী এসব অপরাধে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ ও চাকরি থেকে বরখাস্তের মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের ৫৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কেবল নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতার দায়েই কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা যেতে পারে এবং এর জন্য একটি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে। এখানে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ কোনো সরাসরি উল্লেখ নেই।

একইভাবে প্রথম সংবিধির ৪৫(৩) ধারায় শাস্তির কথা থাকলেও ৪৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী কোনো কর্মচারীর রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোনো বৈধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না, যদি না তিনি সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা নেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, আইনে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে বা রাজনৈতিক মতামতের কারণে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, ঢালাওভাবে অভিযোগ করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আদালতে তা খারিজ হয়ে যাবে।