ঢাকা | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,২ ভাদ্র ১৪৩৩

জিপিএ-৫ পেয়েও আনন্দের বদলে দুশ্চিন্তা

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও খুশির বদলে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জয়পুরহাট সদর, রাজশাহীর বাঘা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর। দারিদ্র্যকে জয় করে ভালো ফল অর্জন করলেও অভাবের কারণে তাদের উচ্চমাধ্যমিকে পড়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিন মেধাবীর একজন সন্ধ্যা খাতুন। পরিবারে বলতে ভাঙাচোরা টিনের ঘর—বৃষ্টি এলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। চরম অভাব-অনটনের মাঝে এককক্ষের সেই ঘরে মা-বাবা আর ছোট বোনকে নিয়ে থেকেই সে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। কিন্তু তার পরিবারের পক্ষে এখন একটি ভালো কলেজে পড়াশোনার খরচ চালানো একপ্রকার অসম্ভব। আগামী দিনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ভারী হয়ে উঠেছে তাদের মন।

সন্ধ্যা খাতুন রাজশাহীর চারঘাটের বামনদিঘী মন্ডলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বামনদিঘী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে সে। তার বাবা বকুল আলী ইটভাটার শ্রমিক এবং মা মান্নি আরা বেগম গৃহিণী।

বামনদিঘী মন্ডলপাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় সন্ধ্যার সঙ্গে। সে বলে, আমার স্বপ্ন বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবো। অনেক কষ্টের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। এখন ভালো একটি কলেজে ভর্তি হতে চাই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই। সন্ধ্যার মা মান্নি আরা বেগম বলেন, মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি অনেক আগ্রহ। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নেই। সরকারি সহযোগিতা করলে মেয়েটা ভালোভাবে পড়তে পারত।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার মাধাইনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে কণিকা রাণী পাল। তার ইচ্ছা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার। সে পর্যন্ত যাওয়া তো অনেক দূর, এখন কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না সেই চিন্তায় কাঁদছে মেয়েটি।

সদর উপজেলার মাধাইনগর বাজারের পাশেই তাদের মাটির বাড়ি। বাবা গোপাল চন্দ্র পাল দরজি শ্রমিক। মা মালতি রাণী পাল বাড়িতে মাটির পাত্র তৈরি করেন।

প্রধান শিক্ষক এনামুল হক বেতন ভাতা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের যাবতীয় ব্যয়ভারে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাকে সহযোগিতা করেন। আর সারাবছর বিনা টাকায় টিউশনিতে সহযোগিতা করেন স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক।

মা মালতি রাণী পাল বলেন, অভাবের কারণে পড়ালেখা বন্ধের কথা বললেই মেয়ের দুচোখ দিয়ে জল ঝরে। তার বাবার সামান্য আয়ে সংসারই চলে না। নিজেও মাটির পাত্র বানিয়ে বিক্রি করি। দুজনের এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাব না মেয়েকে পড়ালেখা করাব?

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক বলেন, অর্থাভাবে মেয়েটি যদি কলেজে ভর্তি হতে না পারে তাহলে সব অর্জন বৃথা যাবে। প্রধান শিক্ষক এনামুল হক বলেন, শুধু কণিকা নয় অভাবের কারণে স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীর যেন পড়ালেখা বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা সবসময় থাকবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার লাভাঙ্গা গ্রামের শিক্ষার্থী ইতি খাতুন রাণীহাটি এম এল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে।

পরীক্ষার শেষদিকে অসুস্থ বাবা মারা যান। তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। এখন সংসারে আছে ইতি, তার মা ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোন। সংসার চলবে না, কলেজে ভর্তি হবে এ চিন্তায় দিন কাটছে ইতির। সে জানায়, গরিব শিক্ষার্থীরা যেন ঝরে না পড়ে এজন্য একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চায় সে।