ঢাকা | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,১৪ আষাঢ় ১৪৩৩

কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮৪৮৬ শিক্ষকের পদ শূন্য

দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আট হাজার ৪৮৬টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক। এর মধ্যে দুই হাজার ২০৪টি শূন্য পদে নিয়োগের সুপারিশ চেয়ে ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) রিকুইজিশন পাঠানো হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

রোববার জাতীয় সংসদের বৈঠকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ–৩ আসনের জামায়াতের সদস্য মো. নুরুল ইসলাম এবং কুমিল্লা–৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ পৃথক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

মন্ত্রী জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা এবং লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস নামে একটি নতুন পাঠ্যপুস্তক চালু করা হবে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষক পদের মধ্যে বর্তমানে সাত হাজার ৭৪ জন কর্মরত আছেন। আট হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য রয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইনস্ট্রাক্টর (৯ম গ্রেড) ও জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (১০ম গ্রেড) পদে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে বিসিএস (ক্যাডার ও নন-ক্যাডার) পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে দুই হাজার ২০৪টি শূন্য পদে নিয়োগের সুপারিশ চেয়ে পিএসসিতে রিকুইজিশন পাঠানো হয়েছে। ৪৫তম বিসিএসে পিএসসি ৯৭ জন ক্যাডার এবং ৩৪৯ জন নন-ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, পদোন্নতির মাধ্যমেও শূন্য পদ পূরণ করা হয়ে থাকে। তবে পদোন্নতিযোগ্য চার হাজার ১৩১টি শিক্ষক ও কর্মচারীর পদে কর্মরত জনবল না থাকায় সেসব পদে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের এনসিপির সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য ‘কারিগরি শিক্ষা’ বিষয়ে নতুন একটি পাঠ্যপুস্তক চালু করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্র, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।

আবদুল্লাহ আল আমিনের পৃথক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, পাহাড়ি অঞ্চলে যে সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে তাদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা নিরসনের লক্ষ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদরি ও গারো মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (এমএলই) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫টি ভাষার (চাকমা, গারো, মারমা, ত্রিপুরা ও সাদরি) শিক্ষকদের মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু হয়েছে। যার ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

যশোর–৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দময় এবং তাদের সুপ্ত প্রতিভার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ নিশ্চিত করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন একটি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, আত্মপ্রকাশের সক্ষমতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে শিখন কার্যক্রম আরও অংশগ্রহণমূলক ও আনন্দময় হবে।

বাগেরহাট–২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হকের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার কারণে যেসব এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি-বিধান অনুসরণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বকেয়া এমপিও পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করলে বিধি অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

কক্সবাজার–৩ আসনের সরকারদলীয় সদস্য লুৎফুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭৪টি। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৬টি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ২টি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ৩০টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৮টি এবং প্রকৌশল, কৃষি, মেডিকেল ও অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ৮টি রয়েছে।

গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়ারেছের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন আছে। একজন শিক্ষক/কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পেয়ে থাকেন। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য ৮৭১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অবসর তহবিলে প্রায় ১৩০০ কোটি রয়েছে। যেখানে ঘাটতি ৭৪১০ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট হতে গত ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৩১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ প্রয়োজন।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এছাড়া আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর জন্য সফটওয়্যার পুনরায় চালুকরণ, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাসের মাধ্যমে সরাসরি, শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসেবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমা হওয়া ৬৪ হাজার ৭৭৫ পেন্ডিং আবেদন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সম্ভাব্য ১৫ হাজার ৫৪৫টি আবেদনসহ মোট ৮০ হাজার ৩২০টি আবেদন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত আয় ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৭১৭৬ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।