কুষ্টিয়ায় বসতভিটা ও জমিজমা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয়প্রধান অধ্যাপক মসলেম উদ্দিন মণ্ডলকে (৫৫) পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বজনের বিরুদ্ধে। ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
নিহত অধ্যাপক মসলেম উদ্দিন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হররা ডাক্তারপাড়ার আবেশ মণ্ডলের ছেলে। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী বা সন্তান না থাকায় তিনি একাই বসবাস করতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিকটাত্মীয়দের বড় অংশের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না বলে জানা গেছে।
স্বজন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক মসলেম উদ্দিনের পৈতৃক ভিটার মাত্র ৪ শতাংশ জমি নিয়ে তার ফুফাতো ভাই রওশন মণ্ডলের ছেলে জহুরুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। জহুরুল ওই জমি নিজেদের দাবি করে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণ করে বসবাস আসছিলেন। স্থানীয় একাধিক সালিশে সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি আদালতে গড়ায়। স্থানীয় আদালত এবং হাইকোর্ট উভয় পর্যায়েই রায় মসলেম উদ্দিনের পক্ষে আসে। গত বছর আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ জমি বুঝিয়ে দিতে গেলে প্রতিপক্ষের কারণে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, গত ১৭ জুন সন্ধ্যায় বিরোধপূর্ণ জমিতে অবস্থিত একটি আমবাগান থেকে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ সময় রওশন মণ্ডলের ছেলে জহুরুল ইসলাম ও মামুন, বিশু মণ্ডলের ছেলে আশরাফুল, শাজাহান মণ্ডলের ছেলে মিঠুন এবং জয়নাল মণ্ডলের ছেলে উজ্জ্বল, মাহাবুলসহ কয়েকজন লাঠি ও হাতুড়ি নিয়ে অধ্যাপক মসলেম উদ্দিনের ওপর উপর্যুপরি হামলা চালায়। হাতুড়ির আঘাতে তার বাম পা, ডান হাত, গোড়ালিসহ শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড়-মাংস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলাকারীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়।
পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় রেফার করেন। ঢাকার নিটোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে তিনি মারা যান। চিকিৎসকদের দেওয়া মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘সেপটিক শক’ উল্লেখ করা হয়েছে। শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমানের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নিহতের শরীরে একাধিক গুরুতর জখম, প্লাস্টার ব্যান্ডেজ ও কালচে দাগের বিবরণ রয়েছে।
ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ কুষ্টিয়ায় আনা হলে শনিবার সকাল ৯টায় হররা গ্রামের ঈদগাহ মাঠে প্রথম এবং সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে নিহত শিক্ষকের বড় ভাইয়ের মেয়ে বুলু খাতুনের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
নিহতের ভাইঝি মোছা. বুলু খাতুন জানান, আসামির তালিকায় জহুরুল, মামুন, উজ্জ্বল, মাহাবুলসহ মোট ১১ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে আটজন পুরুষ ও তিনজন নারী। তিনি জানান, কাকাকে তারা নিজেরাই দেখাশোনা করতেন। অনেক বছর আগে কাকার বিয়ে হলেও সেই সম্পর্ক টেকেনি এবং সাত বছর ধরে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, ঘটনার দিন খবর পেয়েই পুলিশ আহত অধ্যাপককে উদ্ধার করেছিল। দুপক্ষের মামলা আগে থেকেই চলমান। তবে নিহতের নিজস্ব পরিবার না থাকায় নিকটাত্মীয়ের অভাবে মামলার কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। বর্তমানে এক ভাতিজি থানায় আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছেন। মামলা করা সম্পন্ন হলেই আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।
এদিকে অভিযুক্ত জহুরুল ইসলামের ভাবি শিখা দাবি করেন, ঘটনার রাতে কী ঘটেছে, তিনি জানেন না। তবে বর্তমানে অভিযুক্তরা সবাই পলাতক। অধ্যাপক মসলেম উদ্দিনের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সাবেক শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে আসে। তারা এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।




