ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পা রাখলেই মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে বহু বছর আগে। পুরান ঢাকার শাখারি বাজার তেমনই এক ঐতিহাসিক জনপদ, যেখানে এখনও টিকে আছে মুঘল আমলের সংস্কৃতি, পুরনো স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মানুষের শত বছরের জীবনধারা। সরু গলি, প্রাচীন ভবন, শঙ্খের শব্দ আর পুরান ঢাকার চিরচেনা কোলাহল মিলিয়ে শাখারি বাজার যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের নাম।
পুরান ঢাকার ইসলামপুর ও নবাবপুর এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত শাখারি বাজার বহু বছর ধরেই রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল শাসনামলে শঙ্খশিল্পে দক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের এখানে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। তারা মূলত শঙ্খ কেটে বালা, অলংকার ও ধর্মীয় উপকরণ তৈরি করতেন। সেই ‘শাখারি’ সম্প্রদায়ের নাম থেকেই পরবর্তীতে এই এলাকার নাম হয় শাখারি বাজার।
একসময় শঙ্খশিল্পের জন্য পুরো উপমহাদেশেই পরিচিত ছিল এই জনপদ। এখনও কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় সেই পেশা ধরে রেখেছেন। ছোট ছোট দোকানে বসে কারিগররা শঙ্খ কাটেন, পালিশ করেন এবং তৈরি করেন বিয়ের শাখা-পলা। বিশেষ করে হিন্দু বিবাহিত নারীদের কাছে এসব অলংকারের আলাদা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। আধুনিকতার ছোয়ায় পেশার ধরন বদলালেও ঐতিহ্যের সেই আবহ এখনও টিকে আছে শাখারি বাজারের অলিগলিতে।
শাখারি বাজারের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী। এখানে দাড়িয়ে থাকা বহু ভবনের বয়স শত বছরেরও বেশি। সরু রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা ভবনগুলো বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ভেতরে দীর্ঘ ও জটিল কাঠামোতে নির্মিত। অনেক ভবনের দেয়ালে এখনও দেখা যায় পুরনো নকশা, কাঠের কারুকাজ এবং মুঘল ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মিশ্রণ। কিছু বাড়ির ভেতরে রয়েছে ছোট ছোট মন্দির, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের ধর্মীয় জীবনের অংশ হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।
পুরান ঢাকার সংস্কৃতি মানেই উৎসব, আর শাখারি বাজার সেই উৎসবের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী কিংবা কালীপূজার সময় পুরো এলাকা রঙিন আলোকসজ্জা ও সাজে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তখন শুধু স্থানীয়রাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসেন এই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ দেখতে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ আশপাশের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে ভক্তদের ভিড় বাড়ে কয়েকগুণ। সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এই চিত্র পুরান ঢাকার বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শাখারি বাজার শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি পুরান ঢাকার সামাজিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার মানুষ এখনও প্রতিবেশী সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে জীবনযাপন করেন। সরু গলির মধ্যে শিশুদের খেলাধুলা, পুরনো বারান্দায় আড্ডা কিংবা উৎসব ঘিরে সম্মিলিত আয়োজন—সবকিছু মিলিয়ে এখানে এখনও টিকে আছে পুরান ঢাকার চিরচেনা সামাজিক সংস্কৃতি।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা সংকটও বাড়ছে এই ঐতিহ্যবাহী এলাকায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, অগ্নিনিরাপত্তার অভাব এবং পুরনো ঝুকিপূর্ণ ভবন এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শাখারি বাজার শুধু একটি আবাসিক এলাকা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। তাই এই এলাকাকে সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। পরিকল্পিত সংস্কার, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঐতিহাসিক ভবনগুলো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে পুরান ঢাকার এই অনন্য জনপদের গল্প।
আধুনিক কংক্রিটের শহরের ভিড়ে এখনও অতীতের স্মৃতি আকড়ে দাড়িয়ে আছে শাখারি বাজার। শত বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় সম্প্রীতি, স্থাপত্যশৈলী আর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে আজও এটি পুরান ঢাকার প্রাণ হয়ে আছে। সময় বদলালেও শাখারি বাজার যেন এখনও বলে চলে ঢাকার ইতিহাস এখনও হারিয়ে যায়নি।





