ঢাকা | শনিবার, ৯ মে ২০২৬,২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

মুক্ত গণমাধ্যম সংকট ও সংগ্রামে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা

৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রবাহের অবাধ অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ের দিন। কিন্তু এই দিবস ঘিরে প্রকাশিত বৈশ্বিক সূচক এবং দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এক ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চ্যালেঞ্জ এবং বহুস্তরীয় সংকটে জর্জরিত, যার প্রতিফলন জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম পরিস্থিতি মূল্যায়নে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোটার্স উইথাউট বর্ডার্স ( আরএসএফ) প্রকাশিত ওয়ার্ড প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, এটি আগের বছরের তুলনায় তিন ধাপ অবনতি। মোট স্কোর কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩.০৫। এই অবনতি একটি গণমাধ্যমের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, নিয়ন্ত্রণ ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বলেই বিশ্বাস করেন বিশেষজ্ঞরা।

এই সূচক পাঁচটি উপাদানের ওপর নির্ভর করে—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনি, সামাজিক ও নিরাপত্তা। এর মধ্যে রাজনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ কিছুটা উন্নতি করলেও অর্থনৈতিক, আইনি, সামাজিক এবং নিরাপত্তা সূচকে অবনতি পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্রকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা সূচকে ১৬১তম অবস্থান সাংবাদিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকেই সামনে নিয়ে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কাঠামোতেও রয়েছে গভীর সমস্যা। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যেমন বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার ও বাসস কার্যত সরকারের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ঘাটতি স্পষ্ট, এখানে এখনো পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার বাহিরে নূন্যতম কিছু প্রকাশ করা যায় না। অন্যদিকে বেসরকারি গণমাধ্যমের বড় অংশ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানাধীন, যারা প্রায়ই গণমাধ্যমকে প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

আইনি কাঠামোও এই সংকটকে আরও জটিল করেছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট বাংলাদেশ এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশ সাংবাদিকদের জন্য এক ধরনের চাপের পরিবেশ তৈরি করেছে বলে মনে করা হয়। এসব আইনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার, নজরদারি এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

এই জাতীয় বাস্তবতার প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। বিশেষ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (কুবিসাস)-এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৩ সালের ৩ জুন রাতে কুবিসাস কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতাসীন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত একটি অংশ এই হামলার পেছনে ছিল।

এর কিছুদিন পরই এই সংগঠনের (কুবিসাসের) অর্থ সম্পাদক রুদ্র ইকবালের (ইকবাল মনোয়ারের) বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বহিষ্কারাদেশ আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। অভিযোগ ছিল, তিনি উপাচার্যের বক্তব্য সংবাদে প্রকাশ করেছেন। অথচ সাংবাদিকদের দাবি, তিনি কেবল সত্য ও হুবহু বক্তব্যই তুলে ধরেছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অনেক ক্ষেত্রে সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক চাপও একটি বড় বাস্তবতা। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের হুমকি, হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ঢাবিসাস)-এর সদস্যদের ওপর ছাত্রদল সংশ্লিষ্টদের হামলার ঘটনাও একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় আহত হওয়ার অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীতে থানায় মামলা নিতে গড়িমসি বা অনীহার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হয় এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য। আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি, কর্মসূচি, দমন-পীড়ন এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা সামনের সারিতে থেকে কাজ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেনি, সেখানে ক্যাম্পাস সাংবাদিকরাই তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনমত গঠনে সহায়ক হন। এই অবদান প্রমাণ করে, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা কেবল একটি সহায়ক ক্ষেত্র নয়—বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহেও এটি একটি কার্যকর ও প্রভাবশালী মাধ্যম।

ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের অবদান যতটা দৃশ্যমান, তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ততটাই অপ্রতুল। তারা নিরলসভাবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে। ক্যাম্পাসের অনিয়ম, ভোগান্তি, দুর্নীতি কিংবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরে জাতীয় পরিসরে আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কোনো পারিশ্রমিক পান না। বড় বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মিত সংবাদ সরবরাহ করলেও তাদের শ্রম থাকে অবৈতনিক, যা একদিকে তাদের পেশাগত অনুপ্রেরণাকে ক্ষুণ্ন করে, অন্যদিকে এই ক্ষেত্রকে আর্থিকভাবে টেকসই হতে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত থাকতে নিরুৎসাহিত হয়—যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে ওঠার পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়েও সাংবাদিকদের জন্য পরিবেশ খুব একটা সহায়ক নয়। অনলাইন হয়রানি, সাইবার হুমকি, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ এসব বিষয় সাংবাদিকতার কাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও কঠিন; তারা কর্মক্ষেত্রে এবং অনলাইনে দ্বৈত চাপের সম্মুখীন হন।

তবুও এই প্রতিকূলতার মধ্যেই ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম তুলে ধরেন, প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন এবং শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেন। কিন্তু তাদের এই অবদান প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা বা আইনি সুরক্ষার পরিবর্তে তারা অনেক সময় হুমকি, চাপ ও শাস্তির মুখোমুখি হন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরা হচ্ছে। Media Freedom Coalition (MFC) মনে করে, ভুল ও অপতথ্য রোধে স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ।

এই প্রেক্ষাপটে Anne Bocandé, আরএসএফ-এর সম্পাদকীয় পরিচালক, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন “আর কতদিন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ ও স্বাধীনতার ক্ষয় সহ্য করা হবে?” এই প্রশ্ন শুধু আন্তর্জাতিক মহলের নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিটি সাংবাদিকের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে গণমাধ্যম এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাষ্ট্রীয় ও আইনি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে সাংবাদিকতা এগিয়ে যাচ্ছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। আর ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা এই সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস তাই কেবল একটি প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা একসময় সত্য বলার কণ্ঠগুলো নীরব হয়ে যাবে, আর সেই নীরবতার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকেই।