ঢাকা | মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬,১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবনে শিক্ষকদের বসবাস!

ফরিদপুর সদরপুর সরকারি কলেজভবন দখল করে বসবাস ও শ্রেণিকক্ষেই কোচিং সেন্টার খোলার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া শিক্ষকরা নিয়মিত কলেজে আসেন না, ক্লাসও করান না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলেজটির একাডেমিক ভবনের একাধিক কক্ষ দখল করে ‘টিচার্স কোয়ার্টার’ বানিয়ে বসবাস করছেন কতিপয় শিক্ষক। একাডেমিক ভবনের কক্ষগুলো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় ভবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কোচিং বাণিজ্য চালাচ্ছেন শিক্ষকরা। সরকারি ছুটির দিনেও (শুক্র ও শনিবার) কলেজ খোলা রাখেন শিক্ষকরা। তবে কোনো অতিরিক্ত ক্লাস বা এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটির জন্য নয়, বরং প্রতিদিনের মতো এই দুদিনও শ্রেণিকক্ষগুলো ব্যবহৃত হয় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ব্যাচ পড়ানোর জন্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, স্যাররা ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান না।

কিন্তু তাদের কাছে প্রাইভেট পড়লে ওই একই ক্লাসরুমে খুব যত্ন করে পড়ান। সরকারি ফ্যান, লাইট আর বেঞ্চ ব্যবহার করে তারা ব্যক্তিগত ব্যবসা করছেন, এটা স্পষ্ট অনিয়ম।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও নিয়মিত কলেজে আসেন অর্ধেকেরও কম। এ ছাড়া শিক্ষকরা নিয়মিত না আসায় অতিরিক্ত চারজন ভলান্টিয়ার শিক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন তারা এই অনিয়ম করে যাচ্ছেন। ফলে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় সিলেবাস শেষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরীক্ষার্থীরা।

কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াজুল ইসলাম (ছদ্মনাম) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা অনেক আশা নিয়ে এই কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এখানে পড়াশোনার চেয়ে স্যারদের ব্যবসার চিন্তা বেশি। একাডেমিক ভবনে স্যাররা থাকেন, এটা কেমন নিয়ম? আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।

অভিযোগ জানিয়ে অভিভাবকরা জানান, সদরপুর সরকারি কলেজে চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে শিক্ষার পরিবেশ দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি এখন অনেকটা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সন্তানকে সরকারি কলেজে পাঠিয়েছি ভালো শিক্ষার আশায়। এখন দেখছি ক্লাসের চেয়ে কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য বেশি। শিক্ষকরা যদি ক্লাসে না এসে কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তবে গরিব ছাত্র-ছাত্রীদের কী হবে? আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একাডেমিক ভবনে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, আমাদের থাকার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি কোয়ার্টার নেই। তাই বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের মৌখিক অনুমতি নিয়েই এখানে থাকছি। তবে এতে ক্লাসের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

শ্রেণিকক্ষে কোচিং করানোর বিষয়ে এক শিক্ষক বলেন, কর্তৃপক্ষের মৌখিক অনুমতি নিয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই কোচিং করাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের অনুরোধেই অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়। একে কোচিং বা ব্যবসা বলা ঠিক নয়।

কলেজের এই নাজুক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজর অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হক বলেন, ‘শিক্ষকদের উপস্থিতির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’ একাডেমিক ভবনে শিক্ষকরা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সদরপুরে থাকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ভবনে থাকছেন। কোচিং বাণিজ্যের বিষয়টি সব সরকারি কলেজেই হচ্ছে। তারা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মৌখিক পারমিশন নিয়ে অনেক আগে থেকেই কলেজের রুম ব্যবহার করে কোচিং করাচ্ছেন।’

সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, ‘আমি এখানে কয়েকদিন হলো যোগদান করেছি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’