‘গুপ্ত’ শব্দকে ঘিরে হঠাৎ করেই উত্তেজনায় ফেটে পড়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। ক্যাম্পাসের দেয়ালে শুরু হওয়া এই প্রতীকী দ্বন্দ্ব দ্রুত রাজপথ পেরিয়ে সংসদীয় আলোচনায় পৌঁছে গেছে। মূলত, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের রেশ থেকেই পরিস্থিতির এমন বিস্তার। ‘গুপ্ত’ বিতর্ককে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অস্থির হয়ে উঠেছে, যা সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও নতুন মাত্রার উত্তাপ যোগ করেছে।
জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় এক ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ‘গুপ্ত’ প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, ‘অনেকেই এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন, গুপ্ত তোমরা। কারণ, তাদের গত ১৬ বছর আমরা দেখিনি। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে (৫ অগাস্ট) পালিয়ে গিয়েছে।’ তারেক রহমান এই কথা বলার পরদিনই এক জনসভায় জামায়াতের আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘অনেকে আমাদেরকে খোঁচা দেয়। আমরা নাকি গুপ্ত নাকি সুপ্ত। লজ্জা! নিজেরা যারা গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে থেকেছেন, সেই লোক যদি আমাকে গুপ্ত বলে, আপনাকে গুপ্ত বলে, আপনার কেমন লাগবে, বলেন!’
সেই থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটি দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বাইরে থেকে সংগঠন পরিচালনা করা হলে তা ‘গুপ্ত’ বলেই বিবেচিত হতে পারে। পাল্টা জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করে রাজনীতি পরিচালনা করাও এক ধরনের ‘গুপ্ত’ আচরণ, যা তারা তারেক রহমানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য বলে দাবি করে।
এই তর্ক-বিতর্ক মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা দ্রুত ছাত্ররাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতার রূপ নেয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দের গ্রাফিতি আঁকাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষ কেবল একটি স্থানীয় বিরোধ ছিল না; বরং এটি রাজনৈতিক প্রতীক ও ভাষার সংঘাতে রূপ নেয়, যেখানে একটি শব্দই হয়ে ওঠে পরিচয়, অবস্থান ও মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী চিহ্ন।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষের উত্তাপ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—দুটি ছাত্র সংগঠনই পাল্টাপাল্টি মিছিল করছে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়। শিবিরের ‘গুপ্ত’ রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ সংক্রান্ত গ্রাফিতি অঙ্কন করেছে ছাত্রদল। আবার শিবিরের পক্ষ থেকে ছাত্রদলকে রামদা দল ও চাঁদাবাজ আখ্যায়িত করে দেয়াল লিখন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করেও নানা ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছে সংগঠনটি। অন্যদিকে ছাত্রদল ও শিবিরে শীর্ষ নেতারা নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে বিষোদগারমূলক পোস্ট দিচ্ছেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনের ভাষ্য, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি বা দেয়াললিখনে ‘গুপ্ত’ লেখার কারণে ছাত্রশিবির তাদের ওপর হামলা করেছে। ‘গুপ্ত’ লেখার কারণে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন কিংবা বিষয়টি তাদের অপছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে তারা আরেকটি গ্রাফিতি আঁকতে পারতো। কিন্তু সেটি না করে তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
ছাত্রশিবিরের দাবি, ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, সিটি কলেজে টানানো তাদের দলীয় পোস্টার নামিয়ে দেয় ছাত্রদল। এ বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়ে বেরিয়ে আসার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে তাদের হাতাহাতি হয় এবং একজন শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করা হয়। তারপর মূল ফটকের বাইরে বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর আঘাত করা হয়, যার প্রতিবাদে বিকেলে মিছিল বের করলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রদল পেছন থেকে হামলা করে বলে দাবি করেন তিনি।

শিক্ষাঙ্গনের এ উত্তাপ সংসদে গিয়ে ঠেকেছে। এ নিয়ে বুধবার (২২ এপ্রিল) সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ঝাঁজালে বক্তব্য দেন। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁঞা বলেন, সরকারকে নাজেহাল করতে চক্রান্ত চালাচ্ছে বিরোধী দল। সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে দেশে আগামী দিনে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি তারা করতে দেবে না। বিরোধী দলকে আমি এটাও বলে দিতে চাই, আমাদের যারা ভোট দিয়েছে তারা আঙুল চুষবে না, বসে থাকবে না। তারা প্রতিবাদ করবে, আমাদের ভোটাররা তাকিয়ে থাকবে না। এ সময় জামায়াতের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ করতে থাকেন।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রথমে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এখানে যে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে—এটা এক্সপাঞ্জ করা হোক। একজন সংসদ সদস্য সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে যে হুমকির ভাষায় কথা বললেন, আমরা এতে আঘাত পেয়েছি এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছি। জনগণ বসে থাকবে না মানে কী? তিনি কি উসকাইয়া দিচ্ছেন জনগণকে? বিশৃঙ্খলার দিকে? এগুলো সংসদীয় আচরণ না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মহল দাবি করছে, এই শব্দটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের হেয় করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার বক্তব্যেও বিষয়টি নতুন মাত্রা পাচ্ছে, যেখানে তারা বিরোধী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সহিংসতাকে তুলে ধরছেন।
শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) জামায়াতের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক সমাবেশে বলেন, শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ফটোকার্ড দিয়ে, অপপ্রচার চালিয়ে ও গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আপনারা শিবিরকে গুপ্ত বলেন? শিবির গুপ্ত নয়। দেশের জনগণ যদি বলে যাঁরা ১৭ বছর পর বাইরে থেকে দেশে ফিরেছেন, তাঁরাই গুপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থেকে যিনি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনিই গুপ্ত। যারা ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে পারেনি, তারাই গুপ্ত।’
‘গুপ্ত’ শব্দটির বর্তমান ব্যবহার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন হলেও এর অপপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ভাষার ব্যবহার নিয়ে সংযত না হয়, তবে এই ধরনের প্রতীকী সংঘাত ভবিষ্যতে আরও বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা প্রকাশ পাবে যুক্তি, তথ্য ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে—শব্দের আঘাতে নয়।





