‘তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল’ হিসেবে আলোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন নিজ দলের তরুণ নেতাদেরই ধরে রাখতে পারছে না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটসঙ্গী হওয়ার সিদ্ধান্তের পর দলটিতে চলছে একের পর এক পদত্যাগ। একই সঙ্গে নতুন করে তরুণদের যুক্ত হওয়া এবং সমর্থন দেওয়ার প্রবণতাও কমে গেছে বলে দলের ভেতরেই আলাপ চলছে।
দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর এনসিপি শুধু শীর্ষ নেতাই হারাচ্ছে না, হারাচ্ছে তরুণদের আস্থা ও আগ্রহও। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর নতুন করে তরুণদের সম্পৃক্ততা কার্যত থেমে গেছে। উল্টো গত এক সপ্তাহে একের পর এক পদত্যাগে সংকুচিত হচ্ছে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি।
গত এক সপ্তাহে এনসিপির অন্তত ১১ নেতা পদত্যাগ করেছেন। অনেকে পদত্যাগের কথা ভাবছেন। সেই সঙ্গে দলটি নিয়ে তরুণদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তরুণ ভোটার ও সংগঠকদের আস্থাহীনতা এনসিপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর দলে একটা গভীর সংকট চলছে। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতাদের অনেকে চলে গেছেন, অনেকে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর প্রভাব পড়ছে।’
দলে এমনকি সমর্থকদের ওপরও প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, ‘মধ্যপন্থী বা ধর্মনিরপেক্ষ তরুণদের বিশাল সমর্থন ছিল এনসিপিতে। গত কয়েক দিনে এমন অনেক ফোন পেয়েছি, যাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।’
এনসিপির নেতারা জানান, আগে যেভাবে তরুণেরা নিজে থেকেই যুক্ত হতে চাইত, এখন সেই আগ্রহ আর দেখা যাচ্ছে না। অনেকে সরাসরি দাবি করছেন, এই প্ল্যাটফরম আর তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তের পর থেকে এনসিপিতে নতুন সদস্য সংগ্রহ কার্যত বন্ধ। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে স্পষ্ট অনীহা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির শক্তি ছিল তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সেই জায়গায় আঘাত আসায় দলটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় চাপে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের বাইরে আমাদের নতুন রাজনীতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আমরা এখন দেখছি সেই পুরোনোতেই আটকে গেল দলটি।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটসঙ্গী হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্তের পর শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাকে হারিয়ে এনসিপি এখন নেতৃত্ব ও সংগঠন নিয়ে সংকটেই পড়েছে। এই অবস্থায় পদত্যাগীদের ফেরাতে এবং যাঁরা পদত্যাগ করতে চাইছেন, তাঁদের আটকাতে দলের আহ্বায়ক ওয়ান টু ওয়ান আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। দলের নতুন মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে এই পদত্যাগীদের নিয়ে বৈঠকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের কো-লিড এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তা অনুমোদিত হতে হয়। অনেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং তাঁদের কাছে দলের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে, যা এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। আহ্বায়ক পর্যায়ে অনেকের সঙ্গে একান্ত যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা কাউকে হারাতে চাই না, চাই না কেউ দল ছাড়ুক।’
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মেহেরাব হোসেন সিফাত বলেন, ‘নতুন একটি দল গঠন করা এবং মানুষের মধ্যে দলটি নিয়ে আগ্রহ ও সমর্থন তৈরি করা সহজ বিষয় নয়। এনসিপি খুব কম সময়ে সেটা পেরেছে। এখন সাময়িক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে কেউ কেউ দল ছেড়ে যাচ্ছেন। আমরা চাই না কেউ দল ছেড়ে যাক। সাংগঠনিকভাবে সবার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।’
খবর আজকের পত্রিকা।






