দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কমিশনের ‘রিসার্চ গ্র্যান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ডিভিশন’-এর আওতায় দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-এর অর্থায়নে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর বিভিন্ন বিভাগ ও অনুষদের শিক্ষকদের ছয়টি গবেষণা প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।
ইউজিসির মূল লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষ গবেষক তৈরি এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানে কার্যকর নীতিনির্ধারণী সহায়তা নিশ্চিত করা। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, গবেষণা কার্যক্রমে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখার পাশাপাশি গবেষণালব্ধ ফলাফলকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত গবেষণা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, শ্রমিক কল্যাণ, জেনেটিক রোগ, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল করিম বলেন, “এই গবেষণা অনুদান লিভার ক্যান্সার নিয়ে আমাদের চলমান গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা মূলত Hepatocellular Carcinoma (HCC) রোগীদের জন্য নতুন biomarker খুঁজে বের করার কাজ করছি, যা ভবিষ্যতে রোগ নির্ণয় ও treatment response বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। আমরা আশাবাদী, এই project সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের liver cancer research ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।”
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইসতিয়াক আহমেদ তালুকদার বলেন, “বাংলাদেশে পোশাক খাতের পুরুষ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার পুরুষ কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৫৮.৭% বিষণ্নতা এবং ৭৩.৬% উদ্বেগে ভুগছেন। মূলত দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ না থাকায় তারা ভয়াবহ ‘বার্নআউট’-এর শিকার হচ্ছেন।
এছাড়া, কারখানার বর্জ্য বা ‘ঝুট’ ব্যবসা কেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের সহিংসতা ও চাঁদাবাজি সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত নগণ্য (মাত্র ০.৪৪%) বাজেট বরাদ্দ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আমরা মনে করি, এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের মানসিক সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি সময়ের দাবি।”
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “উইলসন ডিজিজ (Wilson Disease) হলো একটি বিরল বংশগত রোগ, যা ATP7B জিনের মিউটেশনের কারণে হয়। এই জিন শরীরের অতিরিক্ত কপার (Copper) বের করে দিতে সাহায্য করে। জিনে সমস্যা হলে কপার লিভার, মস্তিষ্ক ও চোখে জমা হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে লিভার ডিজিজ, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ও মানসিক জটিলতা তৈরি করে।
আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশি উইলসন ডিজিজ রোগীদের মধ্যে ATP7B জিনের গুরুত্বপূর্ণ এক্সন (5, 12, 14, 15)-এ কী ধরনের মিউটেশন আছে তা খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি কম খরচের জেনেটিক ডায়াগনোসিস পদ্ধতি তৈরি করা।”
পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাশফিকুল হক চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অত্যন্ত ব্যাপক হলেও রোগ নির্ণয়ে অবহেলা এবং ফার্মেসি বা অনলাইন এআই-এর ওপর অনিরাপদ নির্ভরশীলতা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো—মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণা ও অনিয়ন্ত্রিত স্ব-চিকিৎসার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা। এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি নীতিনির্ধারণী সুপারিশ তৈরি করতে চাই, যা গ্যাস্ট্রিক রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ নিশ্চিত করবে এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জীবনমুখী করে তুলবে।”
অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদেকীন বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব এবং ‘এডুকেশন-জব মিসম্যাচ’ বা শিক্ষার সাথে পেশার যে অসামঞ্জস্যতা, তার প্রকৃত কারণ ও প্রভাব অনুসন্ধান করব। আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় বেকার থাকছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের একটি বিশাল অংশই নিজের পঠিত বিষয়ের বাইরে ভিন্ন সেক্টরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং শিক্ষার্থীর দীর্ঘ সময়ের বিশেষায়িত জ্ঞান—উভয়ই চরমভাবে অপচয় হচ্ছে। আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাজার চাহিদার অভাব এবং একাডেমিক সিলেবাসের সাথে বর্তমান চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল স্কিলের মধ্যে একটি বড় ধরনের ‘গ্যাপ’ বিদ্যমান।
এই গবেষণাটি সম্পন্ন হলে আমরা কারিকুলাম আধুনিকায়ন, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ‘ক্যারিয়ার সেল’ গঠনের মতো কার্যকর নীতিনির্ধারণী সুপারিশমালা তুলে ধরতে পারব। আশা করা যায়, এই গবেষণার ফলাফল আমাদের উচ্চশিক্ষাকে আরও বেশি কর্মমুখী করতে এবং মেধার অপচয় রোধ করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের সরকারি খাতে হিসাবরক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়নে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব অনুসন্ধান করব। কারণ আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন, বাংলাদেশের সরকারি হিসাবরক্ষণে তিনটি ইন্ডিকেটর—যেমন ডাটা ইন্টিগ্রিটি, আন্তঃবর্ষ বাজেট বিশ্লেষণ এবং সঠিক সময়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন—এবং দশটি ইন্ডিকেটরসে শুরু থেকেই D+ গ্রেড পেয়ে আসছে। যেখানে উন্নত বিশ্বে যে সমস্ত দেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা হয়, সেসব দেশের সরকারি হিসাবরক্ষণে সর্বোচ্চ গ্রেড A পেয়ে থাকে। গবেষণাটি সম্পূর্ণ হলে আশা করা যায়, সরকারি খাতের হিসাবরক্ষণের মান অধিকতর উন্নয়ন হবে।”






