ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬,৮ বৈশাখ ১৪৩৩

ঢাবির হোস্টেলে গেস্টরুম করানোর অভিযোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেলে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ সেশনের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।

যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গেস্টরুম ও মানসিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে তারা হলেন লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আল মোসাদ্দেক, খালিদ আব্দুল্লাহ, মোহাম্মদ আনাস, সাবিক ইসলাম, ইব্রাহিম, মনিরুল। তারা সবাই লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গেস্টরুমে উপস্থিত থাকা প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, গত চার দিন ধরে তাদের হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়মমাফিক হয়রানি চলছে। প্রতিদিন রাত ১১:৩০টা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের বসিয়ে রাখা হয়। সিনিয়ররা একে ‘ম্যানার শেখানো’ বললেও বাস্তবে এটি চরম মানসিক হয়রানি বা র‍্যাগিংয়ের পর্যায়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ৪৩তম ব্যাচের মোসাদ্দেক নামের এক শিক্ষার্থী নারী সহপাঠীদের নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো হয় যে, কথা না শুনলে তাদের ৪২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, যারা আরও ‘ভয়ংকর’ বা ‘সাংঘাতিক’। শিক্ষার্থীদের জোর করে রাত জেগে সিনিয়রদের সামনে সালাম দেওয়া এবং আত্মপরিচয় দেওয়ার তথাকথিত শিষ্টাচার পালন করতে বাধ্য করা হয়। সাধারণত ১০০৩ ও ১০০৪ নম্বর রুমে এসব ঘটনা ঘটে। তবে সর্বশেষ গত রাতে হলের ডাইনিং রুমে প্রকাশ্যেই এই কার্যক্রম চলেছে।

গতকাল রাতে ডাইনিং রুমে হওয়া গেস্টরুম নিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকা আরেক শিক্ষার্থী বলেন, রাত ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে। সেখানে ৪৩তম ব্যাচের পাশাপাশি ৪২তম ব্যাচ এবং তারও ওপরের ব্যাচের সিনিয়ররা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ছাত্রদলের পরিচয়ধারী ৪ থেকে ৬ জন বড় ভাই উপস্থিত ছিলেন। তারা নবীনদের সমস্যার কথা জানতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে ‘ইমিডিয়েট সিনিয়রদের’ কথা শোনার কথা বলেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আল মোসাদ্দেক বলেন, নারীদের নিয়ে কথাটা আমি মজা করে বলেছিলাম। আমরা সবাই অর্থাৎ ৪৩ ব্যাচ ও ৪৪ ব্যাচ একসাথে বসেছিলাম। এখানে কোনো গেস্টরুম বা এমন কিছু হয়নি।

আরেক অভিযুক্ত মোহাম্মদ আনাস বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না৷ আমি রাত ১১টা পর্যন্ত টিউশনে থাকি। অভিযুক্ত ইব্রাহিম বলেন, আমি তো তেমন হলে থাকি না। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না৷

ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেল শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সাথে সংযুক্ত। এমন ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন কি না এ বিষয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সহ-সভাপতি মো. আহসান হাবীব ইমরোজ বলেন, আমি এ ঘটনাটি সম্পর্কে শুনেছি। এ বিষয়ে ডাকসু ও হল সংসদ আজকে ভিসির সাথে সাক্ষাৎকার করবে। আমি নিজে হোস্টেলে গিয়ে খোঁজ নেবো। এমন ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে চলতে দেওয়া হবে না৷

ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেলের ওয়ার্ডেন ড. মো. ফরহাদ আলী এ বিষয়ে বলেন, যদি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলছি। বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আমি খুঁজে বের করে হোস্টেল থেকে বহিষ্কার করব। আমার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এ ধরনের কোনো অনৈতিক কার্যকলাপ আমি হোস্টেলে থাকতে দেব না।

তিনি আরও বলেন, অতীতে এমন কিছু ঘটেছে কি না তা আমার জানা নেই, তবে সেই সময় এখন আর নেই। আমরা ইতোমধ্যে একটি মিটিং করে এ বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হোস্টেলের প্রতিটি স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে, প্রয়োজনে সেগুলো যাচাই করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, আজ রাত ৮টায় এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং রয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী চাইলে এর আগে যেকোনো সময় আমার সঙ্গে দেখা করতে পারে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ড. ফরহাদ আলী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অনেক শিক্ষার্থী কষ্ট করে এখানে পড়াশোনা করতে আসে। তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তাদের থাকার জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করতে। তাই কোনোভাবেই এমন নেতিবাচক সংস্কৃতি হোস্টেলে ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।