ঢাকা | বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,১৯ কার্তিক ১৪৩৩

ডিসেম্বর রেইন: হাসিনা কি ফিরবেন?

গ্রামের সেই কুখ্যাত মাতব্বরের গল্পটা আমরা অনেকেই জানি। সারাজীবন গ্রামবাসীকে নানারকম কুটিল চালে অত্যাচার করা সেই মাতব্বর যখন মরণশয্যায়, তখন সে গ্রামবাসীকে ডেকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইল। বলল, “আমি তোমাদের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আমার মৃত্যুর পর তোমরা সবাই মিলে আমার লাশের পেছনে একটা মোটা বাঁশ ঢুকিয়ে চৌরাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে এসো। তাহলে যদি আমার আত্মা একটু শান্তি পায়, আর তোমাদের ক্ষোভ কিছুটা কমে।”

মাতব্বরের আকস্মিক অনুশোচনা শুনে সরল গ্রামবাসী বেজায় খুশি। যেই কথা সেই কাজ; রাতে মাতব্বর মারা গেল, আর গ্রামবাসী পরম উৎসাহে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করে লাশ চৌরাস্তায় বাঁশ দিয়ে খাড়া করে রেখে যে যার ঘরে গিয়ে খুশি মনে ঘুমাল। কিন্তু আসল খেলা শুরু হলো পরদিন সকালে। পুলিশ এসে লাশ নামাল, আর মাতব্বরের চতুর সন্তানেরা পুরো গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে ‘লাশ অবমাননা’র মামলা ঠুকে দিল। পুলিশ যখন গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতাকে ধরে ধরে থানায় নিয়ে যাচ্ছে, তখন হাজতের লোহার শলাকা ধরে কাঁদতে কাঁদতে গ্রামবাসী বিলাপ করছিল—“হায়রে খবিস মাতব্বর! তুই জীবিত থাকতেও আমাদের জ্বালিয়েছিস, মরে গিয়েও জ্বালানো ছাড়লি না!”

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর ভারতের মাটিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “অচিরেই ফিরে আসার” কথিত অডিও বার্তা কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের “ডিসেম্বর রেইনের” মতো ফাঁকা আওয়াজগুলো ঠিক এই কুটিল মাতব্বরের শেষ চালের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

টানা পনেরো বছর ধরে দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ, গুম, খুন এবং জুলাই-আগস্টের নৃশংস গণহত্যার পর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা যখন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তখন দেশের মানুষ হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল। ভেবেছিল, স্বৈরাচারের কবল থেকে দেশ চিরতরে মুক্ত হলো। কিন্তু না; জীবিত মাতব্বরের অত্যাচার যেমন শেষ হয়েছিল, মৃত মাতব্বরের কুটিল বুদ্ধি যেমন পুরো গ্রামকে তছনছ করে দিয়েছিল—ঠিক তেমনি শেখ হাসিনা ও তাঁর দোসররা ক্ষমতায় থেকে যেভাবে উন্নয়নের নামে দেশটাকে ধ্বংস করেছিল, এখন ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে গিয়েও দেশটাকে ধ্বংস করতে চাইছে। মাঝে মাঝেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর কথিত অডিও ক্লিপগুলোতে শোনা যায় কর্মীদের চাঙ্গা করার মরিয়া ও অবাস্তব চেষ্টা—“আমি খুব কাছাকাছিই আছি, ঝুপ করে ঢুকে পড়ব। “আর এই বার্তাকে পুঁজি করে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মী প্রচার করছে এক অদ্ভুত তত্ত্ব—“ডিসেম্বরের বৃষ্টিতেই নাকি হাসিনা ফিরবেন!”

দেশে ফেরার বাস্তব সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও কেন এই অনবরত ফাঁকা আওয়াজ আর ষড়যন্ত্র? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ও কুটিল চাল। শেখ হাসিনা খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর পনেরো বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাতগুলোকে নির্বিচারে লুটের মাধ্যমে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ দোসরেরা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সরকারের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

আর ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করতে চান হাসিনা। তাঁর উদ্দেশ্য হলো, অনবরত ফেরার আওয়াজ তুলে এবং দেশের ভেতর অস্থিতিশীলতা তৈরি করে বহির্বিশ্বে একটি চরম নেতিবাচক বার্তা বা ‘খারাপ মেসেজ’ পাঠানো। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখাতে চান যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং দেশের অবস্থা মোটেও ভালো নয়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ করতে ভয় পায়, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো সংস্থাগুলো যেন ঋণ দিতে ইতস্তত বোধ করে।

অর্থনৈতিকভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে পুরো দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার এই নতুন চালের চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে সম্প্রতি দেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস খাতে সৃষ্ট তীব্র আন্দোলনের দিকে তাকালে। সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে উসকানি দিয়ে গার্মেন্টস সেক্টরে যে অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল, তা মূলত দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ব্লু-প্রিন্ট। হাসিনা ভালো করেই বোঝেন, দেশের অর্থনীতি সচল থাকলে এই সরকার টিকে যাবে, তাই ক্ষমতার লোভে তিনি এখন পুরো দেশের রুটি-রুজির ওপর আঘাত হানতেও দ্বিধাবোধ করছেন না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনা তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন বাংলাদেশের মাটিতে সশরীরে পা রাখবেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যার যে পর্বতসম প্রমাণ ও মামলা তাঁর বিরুদ্ধে ঝুলে আছে, তাতে দেশে ফিরলেই তাঁর ফাঁসি নিশ্চিত। আর এই ধ্রুব সত্যটি জানেন বলেই, মাঠের কর্মীদের স্রেফ বোকা বানাতে আর দেশের ভেতরে একটা কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখতে এই ফাঁকা আওয়াজ দেওয়া হচ্ছে। আইনি, প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর ফেরার এই দাবি কতটা হাস্যকর এবং অসম্ভব।

পাসপোর্টের চাতুরি এবং হাইকমিশনের বাস্তবতা
আওয়ামী লীগের প্রচারণায় প্রায়ই ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে বলা হয়, ইউনূস সরকার প্রতিহিংসাবশত শেখ হাসিনার পাসপোর্ট বাতিল করেছে। কিন্তু তারা নিখুঁতভাবে এই সত্যটি চেপে যায় যে, বাতিল হওয়া পাসপোর্টটি ছিল তাঁর ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট’। তিনি যেহেতু আর দেশের প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ সদস্য নন, তাই নিয়ম অনুযায়ী এই পাসপোর্ট বাতিল হওয়াই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র কিন্তু তাঁর নতুন সাধারণ পাসপোর্টের আবেদনের ওপর কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।

শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফিরতে চাইতেন, তবে তিনি এতদিনে নতুন সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতেন কিংবা বাংলাদেশে আসার জন্য একটি ‘ট্রাভেল পাস’ (ভ্রমণ পারমিট) চাইতেন। কিন্তু এখানে লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত ও আইনি বাধা। পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের আবেদন করতে হলে তাঁকে সশরীরে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে উপস্থিত হয়ে আঙুলের ছাপ ও ছবি দিতে হতো। যে নেত্রী আজ পর্যন্ত দিল্লির ঠিক কোথায়, কোন সুরক্ষিত সেফ হাউজে আছেন তা খোদ ভারত সরকার ছাড়া কাউকেই জানতে দেননি, সেই রহস্যময়ী মহিলার পক্ষে জনসম্মুখে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন করা কি আদৌ সম্ভব? গোপন আস্তানা থেকে বের না হয়ে তিনি কীভাবে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করবেন? এই সাধারণ প্রশ্নের উত্তর তাঁর অন্ধ ভক্তদের কাছে নেই।

বন্দী বিনিময় চুক্তির আইনি মারপ্যাঁচ
দ্বিতীয় বড় বাধাটি হলো ভারতের রাজনৈতিক ধোঁয়াশা এবং বন্দী বিনিময় চুক্তির ভুল ব্যাখ্যা। ভারত সরকার এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহলে বা বাংলাদেশের কাছে অফিশিয়ালি ঘোষণা করেনি যে শেখ হাসিনা ঠিক কী স্ট্যাটাসে সে দেশে অবস্থান করছেন। আর এখানেই লুকিয়ে আছে ভারতের এক সুদূরপ্রসারী চাল।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি ‘বন্দী বিনিময় চুক্তি’ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই চুক্তির আলোকেও শেখ হাসিনাকে হুট করে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব নয়। চুক্তির মূল শর্তই হলো—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেই দেশের ‘অফিশিয়াল বন্দী’ বা বিচারাধীন আসামি হতে হবে। ভারত যেহেতু শেখ হাসিনাকে বন্দী হিসেবে ঘোষণা করেনি, বরং বিশেষ অতিথি বা আশ্রিত হিসেবে রেখেছে, তাই টেকনিক্যালি তিনি ভারতের কোনো ‘বন্দী’ নন। আর তিনি যদি বন্দীই না হন, তবে বন্দী বিনিময় চুক্তি তাঁর ওপর কার্যকর করার কোনো আইনি সুযোগ বাংলাদেশের হাতে নেই। ফলে এই চুক্তি দিয়ে তাঁকে জোর করে ফিরিয়ে আনা যাবে—এমন ভাবনাও এক ধরণের ধোঁয়াশা।

দালাই লামার নজির এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি যুদ্ধ
ধরা যাক, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানা দেখিয়ে ভারতের আদালতে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে মামলা করল। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাস বলে, এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর, এমনকি দশকের পর দশক ঝুলিয়ে রাখা সম্ভব। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা।

চীন যখন দালাই লামাকে বন্দি বা ফেরত চেয়েছিল, তখন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। আদালত দালাই লামাকে চীনের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায় এই শর্তে যে—তিনি ভারতের মাটিতে বসে চীন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য বা কর্মকাণ্ড করতে পারবেন না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারত ঠিক এই নীতিই বজায় রাখতে চাইছে। তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে ভারতের আদালত ও সরকার এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বছরের পর বছর টেনে নিতে পারে, যা কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না।

অতএব, যে নেত্রী আইনি কাগজের অভাবে দিল্লির সেফ হাউজ থেকে বের হতে পারেন না, যাঁর আইনি স্ট্যাটাস খোদ ভারতই গোপন রাখছে, এবং যাঁর প্রত্যর্পণ ঠেকাতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি আইনি ঢাল প্রস্তুত রয়েছে—তাঁর মুখে “ঝুপ করে ঢুকে পড়ার” গল্প স্রেফ মনগড়া রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়।

শীতের শেষে ডিসেম্বরের রেইনকোট হয়তো আলমারিতেই রয়ে যাবে, কিন্তু শেখ হাসিনার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি আর কোনোদিন আসবে না। গ্রামের সেই কুটিল মাতব্বরের মতোই, তিনি জীবিত থেকেও দেশের মানুষকে পুড়িয়েছেন, আর এখন দূর দেশে বসে মিথ্যা আশার বাঁশ দিয়ে নিজের কর্মীদেরই রাজনৈতিক আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আর বিভ্রান্ত কর্মীরা দিনশেষে সেই বিলাপের মুখেই পড়ছে—“হায়রে নেত্রী, ক্ষমতায় থাকতেও জ্বালিয়েছেন, ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েও আমাদের জ্বালানো ছাড়লেন না!”

লেখক: জামাল হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক।