যুগের পরিবর্তন মানে শুধু সময়ের পরিবর্তন নয়; বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে পরিবর্তন ও সমৃদ্ধ করার নামই হচ্ছে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা নিজেদের কোন পথে পরিচালিত করছি?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করে নিজেকে একজন শিক্ষিত, মার্জিত, দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে পড়ে, অসৎসঙ্গে মিশে কিংবা অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত হয়ে কেউ কেউ নিজের জীবনকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর নামে আমরা কোন পথটি বেছে নেব?
বিশেষ করে আমাদের সন্তানরা যেন সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে, সে ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে পরিবারের মতো কার্যকর ভূমিকা অন্য কেউ রাখতে পারে না। ছোটবেলায় সন্তান ভুল করতে পারে, অসৎসঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে কিংবা সাময়িকভাবে বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বয়সের কারণে এমন বিচ্যুতি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। বরং সন্তানকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব মা-বাবা ও পরিবারের।
এজন্য সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অবসর সময় কীভাবে কাটাচ্ছে, তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। সন্তানকে শুধু শাসন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং তার মনের কথা বোঝা, তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, মহাভুল করার আগেই সন্তানকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে সেটিই হবে পরিবারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
প্রতিদিনের মতো নিজের গাড়িতে করে অফিসে যাচ্ছিলাম। কচুক্ষেত বাজারের সামনে হঠাৎ চোখে পড়ল তিনটি অল্পবয়সী ছেলে পাশাপাশি গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম, কাঁধে স্কুলব্যাগ। বয়স অনুমান করে মনে হলো, সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলেগুলোকে এই লেখায় টেনে আনার পেছনে একটি বিশেষ কারণ রয়েছে।
হঠাৎ লক্ষ করলাম, তিনটি ছেলের হাতেই সিগারেট। তারা দিব্যি সিগারেট টানতে টানতে হেঁটে যাচ্ছে। আশপাশে কে দেখছে, কে কী ভাবছে, সেদিকে যেন তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, সিগারেট খাচ্ছে তো কী হয়েছে? এতে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল? না, মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। কিন্তু স্কুলের পোশাক পরা অল্পবয়সী ছেলেদের প্রকাশ্যে এভাবে সিগারেট পান করতে দেখা নিঃসন্দেহে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি অশনিসংকেত।

আমার নিজের ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ে। আমরা শুধু নিজের বাবা-চাচাকেই নয়, এলাকার মুরুব্বিদেরও সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্মান করতাম। সাইকেল চালানো অবস্থায় কোনো মুরুব্বিকে সামনে পড়তে দেখলে সাইকেল থেকে নেমে সালাম দিতাম। আর প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়ার কথা তো কল্পনাই করা যেত না। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামাজিক শিষ্টাচার ও মূল্যবোধেরও কি এতটাই পরিবর্তন হয়ে যাওয়া উচিত?
এবার আসি সিগারেট প্রসঙ্গে। কেউ হয়তো বলবেন, সিগারেট খাওয়া আর এমন কী অপরাধ! আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাই। সিগারেট পান করাকে সরাসরি বড় কোনো অপরাধের সঙ্গে তুলনা করছি না। তবে অল্পবয়সী একটি ছেলে যে সিগারেট পান করা ক্ষতিকর এবং অনুচিত, তা জানে না—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। অথচ সেই বয়সেই সে প্রকাশ্যে সিগারেট পান করছে। এর অর্থ, নিজের বয়স, সামাজিক পরিবেশ, পারিবারিক শিক্ষা কিংবা প্রচলিত শিষ্টাচারের কোনো কিছুকেই সে আর গুরুত্ব দিচ্ছে না।
আমার আশঙ্কার জায়গাটি ঠিক এখানেই। সিগারেটের প্রতি আসক্তি নিজেই স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পাশাপাশি অল্প বয়সে নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক অনুশাসনকে অবজ্ঞা করার প্রবণতা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। অসৎ সঙ্গ, মাদকাসক্তি কিংবা অপরাধপ্রবণতার মতো বিষয়গুলো থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে হলে শুরু থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। অবশ্যই সিগারেট পান করলেই কেউ অপরাধী হয়ে উঠবে, এমন সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। কিন্তু সন্তানের আচরণে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আমরা প্রায়ই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকি। তাদের ভালো স্কুলে পড়াতে চাই, ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করি, প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু শুধু ভালো ফলাফল কিংবা ভালো চাকরি পেলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে ভালো মানুষ হয়ে ওঠে না। তার মধ্যে নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, শিষ্টাচার এবং ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতাও তৈরি করতে হয়। আর এসব গুণাবলি গড়ে ওঠার প্রথম ও প্রধান প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পরিবার।
সুতরাং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সন্তানরা এগিয়ে যাক, আমরা অবশ্যই তা চাই। কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়াটা যেন জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে হয়। সন্তান কতটা আধুনিক হলো, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কতটা দায়িত্বশীল, বিবেকবান ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠল।
কারণ, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই বড় কথা নয়; বরং কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছি, সেটি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক





