ঢাকা | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষার্থীদের ১৩০ স্বর্ণপদক গায়েব, দুদকে অভিযোগ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষার ভালো ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ থেকে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীকে ‘ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুত করা হয় এবং ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিকভাবে তা হস্তান্তরের কথা ছিল।

তবে ওই সময় দেশব্যাপী কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে অনুষ্ঠানের ঠিক তিন দিন আগে ২১ জুলাই রাতে এসএমএসের মাধ্যমে সাময়িকভাবে অনুষ্ঠানটি স্থগিত ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেই ১৩০ শিক্ষার্থীকে আর কোনো সম্মাননা প্রদান করা হয়নি।

চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন একটি তালিকার মাধ্যমে ৫৮ জন শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। যেখানে উপহার হিসেবে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টের কী হয়েছে, পুরস্কারের তালিকা কেন পরিবর্তন করা হলো এবং এর পেছনে কী প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত ছিল, সেসব বিষয়ে তদন্তের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন পুরস্কার থেকে বাদপড়া শিক্ষার্থীরা।

গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যানের কাছে এ আবেদন করা হয়। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।

দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুলাই জারিকৃত অফিস আদেশে ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের অনার্স এবং ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। একই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মেলনকক্ষে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিতের কথা জানানো হয়। এসএমএসে বলা হয়, অনিবার্য কারণে ২৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে এবং পরিবর্তিত তারিখ পরে জানানো হবে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও পরিবর্তিত তারিখ আর জানানো হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জন্য ১৩০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার পর তাদের বাদ দিয়ে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। তবে আগের তালিকা বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে ১৩০ শিক্ষার্থীকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া, কেন ও কার সুপারিশে পুরনো তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কী কারণে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে নতুন করে ৫৮ শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হলে তা কোন নীতিমালায় করা হয়েছে? তার অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সুপারিশ ও ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি থাকার কথা। আর যদি ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের তালিকা পুনর্বিবেচনা করে পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়েছে, কোন কমিটি তা করেছে, কী কারণে আগের তালিকা বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে সব তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

পুরস্কার থেকে বাদপড়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও তাদের সাক্ষাৎ দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে অফিস থেকে সনদপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন; তবে তাদের জন্য নতুন কোনো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে না।

শিক্ষার্থীরা বলেছেন, একবার কাউকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার প্রায় দুই বছর পর সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো এবং সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন কখনো অনুষ্ঠানে স্থান সংকুলানের সমস্যা, কখনো প্রশাসনিক সমস্যা প্রভৃতি। এসব যদি সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে পুরস্কারের জন্য আগে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলো কেন?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের ১৯তম সভার সুপারিশের ভিত্তিতে একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেটের ২৫৫তম সভায় সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। নীতিমালার দ্বিতীয় ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃক প্রকাশিত স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতক (পাস) কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনকারী শিক্ষার্থীকে অ্যাওয়ার্ডের জন্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চম ধারায় বলা হয়েছে, অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনকারী একজন শিক্ষার্থীকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হবে। একই নম্বর বা ফল হলে এইচএসসি পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার অষ্টম ধারায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সনদ ও স্বর্ণপদক দেওয়ার কথার উল্লেখ রয়েছে। ফলে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের অফিস আদেশে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর তালিকা পরে কীভাবে পরিবর্তিত হলো, তার প্রশাসনিক ভিত্তি কী এবং ১৩০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও অন্যান্য সামগ্রীর কী হয়েছে সেসবের তদন্ত দরকার।

বাদপড়া শিক্ষার্থীদের দাবি তদন্ত হলে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩০ শিক্ষার্থীর তালিকা, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫৮ শিক্ষার্থীর তালিকা, দুই তালিকার মধ্যে পরিবর্তনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যবিবরণী, অনুমোদনের নথি এবং স্বর্ণপদক-ক্রয় ও বিতরণসংক্রান্ত আর্থিক নথির যাচাই করা হোক। সেই সঙ্গে স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টগুলোর বর্তমান অবস্থাও জানানো হোক।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩০ শিক্ষার্থীকে ‘ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানসংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা পড়েছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনে উপস্থাপন করা হবে এবং কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ ফেরদৌসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।