ঢাকা | সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন: লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান নম্বর

মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও এর আওতাধীন দপ্তর-সংস্থায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৫০-৫০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি। জালিয়াতি ও প্রক্সি পরীক্ষা রোধের অজুহাতে এ সংক্রান্ত নীতিমালার অনুমোদন দেওয়া হলেও সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা এর সমালোচনা করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ায় নিয়োগে স্বচ্ছতা বিনষ্ট হবে এবং স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও দলীয় বিবেচনায় কম যোগ্যদের চাকরি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। আগে লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর থাকায় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের যে সুযোগ ছিল, নতুন নিয়মে তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে যে, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি বা জালিয়াতির মাধ্যমে অনেকে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রকৃত চাকরিপ্রত্যাশীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এটি রোধ করতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর অভিন্ন অর্থাৎ ৫০:৫০ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ‘পরীক্ষার মানবণ্টন বিশেষ বিধিমালা-২০২৬’ প্রণয়নের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

এর আগে বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগবিধির সামঞ্জস্য বিধানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবীরকে সভাপতি করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল সরকার। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধি রাখা হয়। এ কমিটিই মূলত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৫০:৫০ করার সুপারিশ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের জনবল নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কত করার সুপারিশ করেছি, তা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। তিনি এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা জামান দেশের বাইরে থাকায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, লিখিত পরীক্ষায় কোনোমতে পাশ করা প্রার্থীদের দলীয় বা ব্যক্তিগত বিবেচনায় চাকরি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই বিধিমালাটি এভাবে সংশোধন করা হচ্ছে। আগে সাধারণত লিখিত পরীক্ষা হতো ৭৫ বা ৮০ নম্বরের এবং মৌখিক পরীক্ষা হতো ২০ বা ২৫ নম্বরের। তখন লিখিত পরীক্ষায় কেউ কম নম্বর পেলে ভাইভায় পুরো নম্বর দিয়েও তাকে চাকরি দেওয়া কঠিন হতো। কারণ, লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া মেধাবী প্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে লিখিত পরীক্ষায় সর্বনিম্ন পাশ নম্বর (৩০) পাওয়া কোনো দলীয় বা পছন্দের প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় ৫০-এর মধ্যে বেশি নম্বর দিয়ে সহজেই চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত এই বিধিমালা একসময় সরকারের গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধবে।

সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে অপ্রত্যাশিতভাবে কোনো কিছুই স্বচ্ছ হয় না। এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নের ফলে নিয়োগে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে। লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৮০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, দলীয় লোক নিয়োগের জন্য এ ধরনের বাজে কাজ করা হচ্ছে, যা প্রশাসনের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এতে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার পথ সুগম হবে। তাছাড়া তৃতীয় শ্রেণির অনেক কারিগরি পদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগবিধি রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই মানবণ্টন বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করবে। একই মত প্রকাশ করে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, এটি করা ঠিক হবে না, আগের বিধান বহাল রাখা জরুরি। লিখিত ও ভাইভায় সমান নম্বর থাকলে নিয়োগে নিরপেক্ষতা ধরে রাখা যাবে না। দলীয় বিবেচনায় প্রশাসনে অযোগ্য লোক ঢুকবে।