বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা আর নিজেকে গড়ে তোলার এক অনন্য যাত্রা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ এবং নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কতটা ইতিবাচক হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার ওপর।
একজন শিক্ষার্থী যেন নির্ভয়ে ক্লাস করতে পারে, লাইব্রেরিতে সময় কাটাতে পারে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে এবং দিনের শেষে নিশ্চিন্তে হলে বা বাসায় ফিরতে পারে, এমন পরিবেশই প্রত্যাশিত।
বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চলাচল, নিরাপত্তাকর্মীর স্বল্পতা, সিসিটিভি নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হল ও মেসে চুরির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা হয়রানি ও ইভটিজিংয়ের আশঙ্কায় আরও বেশি নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব বিষয়ই বর্তমানে তাদের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় জায়গা দখল করে আছে।
ইতিহাস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় পরিবার হলেও অনেক সময় বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা অনিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। তার অভিযোগ, বহিরাগতদের অশালীন আচরণ, কটূক্তি ও বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহিরাগতদের চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ার জামান খান লেলিন বলেন, ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার প্রথম ধাপ হিসেবে আমি মনে করি প্রাণ ও প্রকৃতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই পরিকল্পনা বিভাগের অদূরদর্শী ও আগ্রাসী কার্যক্রম ক্যাম্পাসের প্রাণ-প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও শিকড়হীনতার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন পর্যন্ত আসা প্রত্যেক ভাইস চ্যান্সেলরের কাছ থেকে প্রকৃতি রক্ষার আশ্বাস পেলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেখিনি, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ফলে প্রশাসন বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে আশ্বাসই দিক না কেন, শিক্ষার্থীরা এখন সহজে তা বিশ্বাস করতে পারে না। আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চাই, আমার ক্যাম্পাসের প্রাণ-প্রকৃতি, জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। এই কাজের জন্য প্রশাসনের সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উভয় প্রান্তে নির্মাণাধীন দুটি গেটের কাজ শেষ হলে বহিরাগতদের প্রবেশ আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং সবাইকে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে হবে। এছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইভটিজিং ও অন্যান্য নিরাপত্তাজনিত ঘটনা প্রতিরোধে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর সচলতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে কাজ করে যাচ্ছে।





