ঢাকা | রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,৮ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল চক্র

ইউরোপের দেশ গ্রিস ও সাইপ্রাসে চাকরির প্রলোভন, আবার কখনো স্টুডেন্ট ভিসায় পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করছে চক্রটি। মাথাপিছু ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তারা এককালীন বিপুল অর্থ নেওয়ার পর তা কয়েক মাস বা বছরের জন্য আটকে রাখে। পরে তিন-চার মাস পরপর ১ থেকে ২ লাখ টাকা করে ভুক্তভোগীকে ফেরত দেওয়া হয়। এতে একজন ভুক্তভোগী ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার পর বাকি অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন। এভাবেই প্রতারণার অর্থ দিয়ে চক্রটি দীর্ঘ সময় ব্যবসা কিংবা অন্যত্র বিনিয়োগ করে লাভবান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো কোনো চক্র এককালীন ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করে তা ব্যাংক বা অন্যত্র বিনিয়োগ করে। সেখান থেকে পাওয়া মুনাফার একটি অংশ দিয়ে মাসে মাসে কয়েক জন ভুক্তভোগীকে সামান্য অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। এতে প্রতারণার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধামাচাপা থাকে এবং নতুন করে আরো মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ পায় চক্রটি।

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গ্রিস ও সাইপ্রাসে পাঠানোর নামে মাথাপিছু ১৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঐ মামলায় ড্রিম লাইনার স্টুডেন্ট অ্যান্ড স্কিল মাইগ্রেশন কনসালটেন্সির কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির অন্যতম হোতা হিসেবে শিরিন আক্তার ওরফে সিনথিয়া ওরফে ফাহমিদা ইয়াদের নাম এসেছে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জে প্রতারণার মামলা রয়েছে। মুন্সীগঞ্জের মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলেও জানা গেছে।

টাঙ্গাইলের লোহান হোসেন তালুকদারের অভিযোগ, গ্রিস ও সাইপ্রাসে পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয় চক্রটি। সাইপ্রাসে পাঠানোর পর থাকা-খাওয়া, চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলে তার সঙ্গে চুক্তিও করা হয়। আসামিরা বিভিন্ন সময়ে ভিসা প্রক্রিয়াসহ নানা খরচের কথা বলে তার কাছ থেকে টাকা নেয়। একপর্যায়ে তাকে একটি ভিসা দেওয়া হয়। পরে সেটি যাচাই-বাছাই করে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রতিকার চাইলে আসামিরা সমঝোতার প্রস্তাব দেন। সমঝোতার জন্য বৈঠকে গেলে শিরিন আক্তার ওরফে সিনথিয়াসহ অন্য আসামিরা তাকে প্রাণনাশ ও গুম করার হুমকি দেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

লোহান হোসেন আরো অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় উত্তরা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ গড়িমসি করে। পরে গত ৯ জুন তিনি আদালতে মামলা করেন। মামলায় ড্রিম লাইনার স্টুডেন্ট অ্যান্ড স্কিল মাইগ্রেশন কনসালটেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ বিন নাসির, চেয়ারম্যান ইউসুফ বিন নাসির জনি, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিনথিয়া ওরফে শিরিন আক্তার, ব্যবস্থাপক রাকিবুল ইসলাম, পরিচালক তৌসিফ, পরিচালক সামিরসহ আরো অজ্ঞাতনামা তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সিনথিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগে বলা হয়, তিনি নিজের নাম ও পরিচয় আড়াল করে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছেন। মামলার নথিতে তার প্রকৃত নাম সিনথিয়া ওরফে ফাহমিদা ইয়াস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জেও তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা রয়েছে সেখানে তার নাম শিরিন আক্তার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ মামলার বাদী রমজান শেখ। মামলা সূত্রে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আশিকুর রহমান তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মুন্সীগঞ্জের ঐ মামলায় এরই মধ্যে দুই জন আটক হয়েছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে মুন্সীগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে বলে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, আসামিদের অফিস পরিবর্তন হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হবে।

গ্রিস-সাইপ্রাসে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগের মধ্যেই স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশে পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এ ঘটনায় নাবিল ইউসুফ নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ‘ভিসা গাইড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে বাদী জারিন তাসনীমসহ অন্তত ৩৬ জনের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর চেক ও রসিদ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাউকে বিদেশে পাঠানো হয়নি। এমনকি নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। গত ৫ জুলাই ভুক্তভোগীরা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে দেখতে পান, অফিসটি সেখান নেই।

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুলাই উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী জারিন তাসনীম। এরপর গত ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের পূর্ব রাজাবাজার এলাকা থেকে নাবিল ইউসুফকে গ্রেফতার করা হয়। এ মামলায় এর আগে সাব্বির হোসেন, মতিউর রহমান, সাইদুর রহমান ও রাবেয়া খাতুন তানিয়া নামে চার জনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র: ইত্তেফাক