ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,৫ ভাদ্র ১৪৩৩

এমপি ও শিক্ষা সচিবের তদবিরে ধর্ষণে অভিযুক্ত শিক্ষকের দায়মুক্তি

ধর্ষণের প্রমাণিত অভিযোগও উড়ে গেলো সংরক্ষিত আসনের এক এমপির ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্রে। ওই পত্রে এমপি বললেন, অভিযোগ ভিত্তিহীন। আর তাতেই বাতিল করে দেয়া হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও বিভাগীর মামলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের তদন্তে পাওয়া প্রমাণিত সত্য। এমনকি ফরেনসিক রিপোর্টের অকাট্য প্রমাণও হালে পানি পেলো না। সংরক্ষিত এমপির এক ডিও লেটারে প্রমাণিত ধর্ষক হয়ে গেলেন ধোয়া তুলসীপাতা।

এই তেলেসমাতি কাণ্ড শিক্ষাপরিমণ্ডলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। খোদ শিক্ষা প্রশাসনের অনেকেই চুক্তিতে নিযুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। সরকার যখন দেশব্যাপী নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন ধর্ষকের পক্ষে এক এমপির এমন ‘বেপরোয়া’ অবস্থান ক্ষমতাসীনদের ইতিবাচক ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

ধর্ষণের প্রমাণিত অভিযোগ থেকে নারী এমপির ডিও লেটারে দায়মুক্তি পাওয়া ওই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা জয়পুরহাট সরকারি কলেজের বাংলা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী। আর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তাকে যিনি দায়মুক্তি দিতে শিক্ষাপ্রশাসনকে বাধ্য করেছেন তার নাম সুরাইয়া জেরিন রনি। তিনি সংরক্ষিত আসন বগুড়া-জয়পুরহাটের এমপি। তার ডিও লেটারের প্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট সহকারী সচিব মো. আবদুল জলিল স্বাক্ষরিত এক পত্রে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। ওই পত্রে স্বাক্ষরকারীর নামের ওপরে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ কথাটি লেখা রয়েছে। চিঠির অনুলিপি মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কলেজ অণুবিভাগের যুগ্মসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের পাঠানো হয়েছে।

এই দায়মুক্তির চিঠিটি পড়লেও ধর্ষণের সত্যতা ও এমপির ডিও লেটারে তা বাতিলের বিষয়টি বোঝা যায়। তাতে লেখা হয়েছে, ‘ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মকালীন জেসমিন আক্তার নামের এক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং ঢাকা শহরে নিয়ে এসে কাজী ছাড়া শুধু হুজুর দিয়ে বিয়ে করেন; যা পরবর্তীতে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি অভিযোগকারী (জেসমিন আক্তার) ও তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দেন; যা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে প্রমাণিত হয় এবং তিনি নৈতিক চরিত্র স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়।’

এর পরের প্যারায় চিঠিতে লেখা হযেছে, ‘যেহেতু তিনি এ নোটিশের জবাব দেন এবং ব্যক্তিগত শুনানীতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করায় গত ২২ জানুয়ারি তার ব্যক্তিগত শুনানি নেয়া হয়। এ শুনানিতে প্রদত্ত বক্তব্য সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৭(২)(ঘ) অনুযায়ী তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বিস্তারিত তদন্ত শেষে গত ৬ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হলেও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, বগুড়া-জয়পুরহাটের, সংরক্ষিত মহিলা আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন আধা-সরকারি পত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যে প্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন।’

চিঠিতে আরো লেখা হয়, ‘যেহেতু বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী, তদন্ত প্রতিবেদন, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের আধা-সরকারি পত্র এবং বিভাগীয় মামলার প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তাকে এ বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেহেতু, সার্বিক বিবেচনায় জয়পুরহাট সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা), সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া) ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। বিধায় তাকে ভবিষ্যতে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে এ বিভাগীয় মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেয়া হয়।’

প্রসঙ্গত, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী এমপির ডিও লেটার কর্তৃপক্ষের নিকট জমা করা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এছাড়াও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়। বিভাগীয় মামলার তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবও ফরেনসিক রিপোর্টসহ তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত উল্লেখ করেন। দায়মুক্তির চিঠিটিতেও ধাপে ধাপে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে এমপির ডিও লেটারের প্রেক্ষিতে সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে বাতিল করে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিও লেটারের বিষয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন বলেন, যে ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে, উনি একজন সজ্জন ব্যাক্তি। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষক ছিলেন। পরে বদলি হয়েছে ওনার। উনি আমার পাশ্ববর্তী গাবতলী উপজেলার একজন বাসিন্দা। আমি তাকে দীর্ঘদিন চিনি, জানি। এখন নারী সংক্রান্ত বিষয় যেটা, আজকাল তো অনেক মেয়েরাই এভাবে ফাঁসায়। আর যে মেয়ে তাকে ফাসিয়েছে, সেই মেয়ের এটা একটা পেশা। এর আগেও একজনকে ফাসিয়ে সে প্রপার্টি নিয়েছে। এনাকেও সেভাবেই ফাসিয়েছেন। উনি আমার ভাই, এলাকার মানুষ তো, যার জন্য ওনার পক্ষে আমি ডিও লেটার দিয়েছি।

এহেন অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দৈনিক আমাদের বার্তায় প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “বিষয়টা আমি দেখছি”।