গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ক্যাম্পাসে নতুন উপাচার্যের যোগদানকে কেন্দ্র করে ডুয়েটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভিসি তার কার্যালয়ে অফিস করেছেন। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন ভিসি নিয়োগ নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর ওই দিন রাত সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। সোমবার সকালে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে ব্লকেড কর্মসূচি শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সকাল থেকেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেন। ‘ডুয়েট থেকে ভিসি চাই’, ‘বহিরাগত ভিসি মানি না’, ‘ডুয়েটের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস মুখর হয়ে ওঠে। এসময় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের জমায়েত দেখা যায়। পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ ও হাসানুর রহমান লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
তারা বলেন, গণতান্ত্রিক দাবিকে যেভাবে সংঘাতে রূপ দিয়ে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করা হয়েছে, সেই দাবি থেকে আমরা পিছপা হব না। বাইরের ভিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকেই ভিসি নিয়োগ দিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিকে যৌক্তিক ও অরাজনৈতিক উল্লেখ করে বলেন, তারা কখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেননি এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতেও অবস্থান নেননি। তাদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর একাডেমিক কাঠামো ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক বেশি তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ প্রয়োজন।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালের ভিসি নিয়োগ বাতিল, ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ এবং গত রোববারের সংঘর্ষে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, গত রোববার তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালানো হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গেইট ভেঙে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয় এবং বাইরে থেকে ইট-পাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ডুয়েট শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও গতকাল একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিশেষ বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ, দুঃখ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়।
শিক্ষক নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার পবিত্র স্থান। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার যেমন সংবিধানসম্মত, তেমনি সহিংসতা, হামলা, ভীতি প্রদর্শন ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা জানান, গত রোববারের ঘটনায় দুইজন শিক্ষক ও অন্তত ১৮ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। শিক্ষক সমিতি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, কোনো পক্ষ যেন পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন শিক্ষক নেতারা।
অন্যদিকে গতকাল বিকেলে ডুয়েট ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও ক্যাম্পাসের বাইরে একটি মার্কেটে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে ছাত্রদল নেতারা বলেন, সরকার যেহেতু নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়েছে, তাই তারা তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তারা অভিযোগ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়ালে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কিছু কর্মী সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘মব ভায়োলেন্স’ ও অস্থিরতা তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এবং ডুয়েটেও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ছাত্রদলের এসব অভিযোগেরও স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।




