প্রতিবছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবে জ্ঞানজগতের অন্যতম মৌলিক ও প্রাচীন শাখা হওয়া সত্ত্বেও গণিতে কোনো নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় না। আলফ্রেড নোবেল কেন গণিতকে এই পুরস্কারের বাইরে রেখেছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা কৌতূহল ও মিথ প্রচলিত রয়েছে।
নোবেলের উইল ও মূল পাঁচটি ক্ষেত্র
গণিতে নোবেল না থাকার মূল কারণ নিহিত রয়েছে আলফ্রেড নোবেলের উইলে। ১৮৯৫ সালে নোবেল যখন তার চূড়ান্ত উইল বা অসিয়তপত্র তৈরি করেন, তখন তিনি তার বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশ এমন ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার নির্দেশ দেন, যারা মানবজাতির কল্যাণে সবচেয়ে বড় অবদান রাখবেন। সেখানে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে পাঁচটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি।
এই তালিকায় গণিতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নোবেলের উইল অনুযায়ী ১৯০১ সাল থেকে প্রথম এই পাঁচটি শাখায় পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। বহুল প্রচলিত একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে অর্থনীতিও হয়তো মূল উইলে ছিল। প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতির পুরস্কারটি আলফ্রেড নোবেলের মূল পরিকল্পনায় ছিল না। তার মৃত্যুর কয়েক দশক পর ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোবেলের স্মরণে অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রবর্তন করে।
ব্যক্তিগত শত্রুতার মিথ বনাম বাস্তবতা
গণিতে নোবেল না থাকা নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত গল্পটি সুইডিশ গণিতবিদ ইয়োস্তা মিত্তাগ-লেফলারকে ঘিরে। লোকমুখে প্রচলিত একটি মুখরোচক গুজবে দাবি করা হয়, মিত্তাগ-লেফলারের সঙ্গে নোবেলের তীব্র ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল এবং এক নারীকে কেন্দ্র করে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। নোবেল নাকি আশঙ্কা করেছিলেন যে গণিতে পুরস্কার দিলে মিত্তাগ-লেফলার তা পেয়ে যেতে পারেন, তাই তিনি গণিতকে বাদ দেন।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই কাহিনীর সপক্ষে কোনো বাস্তব বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলেনি। ম্যাকটিউটর হিস্ট্রি অব ম্যাথমেটিকস এবং ইনস্টিটিউট ফর পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকস (আইএমপিএ) এর গবেষকেরা এই প্রেমের দ্বন্দ্ব ও শত্রুতার গল্পকে নিছক ভিত্তিহীন কিংবদন্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গবেষকদের মতে, নোবেল জ্ঞানের সব বিষয়ের জন্য পুরস্কার চালুর চিন্তা করেননি; বরং তৎকালীন সময়ে মানবজাতির তাৎক্ষণিক ব্যবহারিক অগ্রগতি, প্রায়োগিক আবিষ্কার ও সার্বিক কল্যাণের সঙ্গে যেসব ক্ষেত্র সরাসরি যুক্ত ছিল, তিনি সেগুলোকেই বেছে নিয়েছিলেন।
গণিতবিদদের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি
নোবেল পুরস্কার না থাকলেও গণিতে অসাধারণ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দুটি পুরস্কার রয়েছে। এর একটি হলো আবেল পুরস্কার। ২০০২ সালে নরওয়ে সরকার এটি প্রতিষ্ঠা করে এবং ২০০৩ সালে ফরাসি গণিতবিদ জঁ-পিয়ের সেরে প্রথম এই সম্মাননা লাভ করেন।
এ ছাড়া তরুণ গণিতবিদদের অসামান্য গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর প্রদান করা হয় ফিল্ডস মেডেল, যাকে একাডেমিক বিশ্বে গণিতের নোবেল সমতুল্য হিসেবে গণ্য করা হয়।






