অল্প কয়েক দিন আগে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। হেডিং ছিল—“প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়া প্রিয় সহপাঠীদের খুঁজে বেড়াই আমি।” পোস্টটির অনেকেই প্রশংসা করেছেন। যারা আমার সত্যিকারের বন্ধু, শুধু তারাই জানেন—বন্ধু হিসেবে আমি কেমন।
সত্যিই, আমি প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে বেড়াই। কখনো কখনো মনের ভেতরটা হু হু করে কেঁদে ওঠে, যখন হঠাৎ কোনো হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কথা মনে পড়ে। কেন এতটা খুঁজি? এর একটা কারণ আছে।
একসঙ্গে পড়ালেখা করলেই, একসঙ্গে চলাফেরা করলেই কিংবা পাশাপাশি বসবাস করলেই সবার সঙ্গে সবার বন্ধুত্ব হয়ে যায় না। বন্ধুত্ব হয় মূলত সমমনা মানুষের মধ্যে। বন্ধুত্বের কোনো জাতপাত নেই, ধর্ম-বর্ণ নেই, এমনকি বয়সও অনেক সময় সেখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
আরেকটু খোলাসা করে বললে, বন্ধুত্ব অনেকটা প্রেমের মতোই। প্রেম কি কখনো জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা বয়স মেনে চলে? না, চলে না। বরং অসম প্রেমের কাহিনিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। বন্ধুত্বও অনেকটা তেমনই।
ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে আমরা জীবনে যতদূরই পড়ালেখা করে থাকি না কেন, আমাদের কতজন সহপাঠীর কথা আজও মনে আছে? সবার কথা নিশ্চয়ই মনে নেই। আর মনে থাকার কথাও নয়। কিন্তু একটু চোখ বন্ধ করে দেখুন—ক্লাস ওয়ানের সেই প্রিয় বন্ধু বা বান্ধবীর কথা হয়তো এখনো মনে গেঁথে আছে। চোখ বন্ধ করলেই তাদের মুখাবয়ব আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
নারদ—আমার হারিয়ে যাওয়া এক প্রিয় বন্ধু
নারদ আমার কলেজজীবনের খুব কাছের বন্ধু। আমরা একই গ্রুপে পড়তাম না। কিন্তু একই হোস্টেলে থাকার কারণে অন্য অনেকের মতো নারদও একসময় আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল।
তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো—বন্ধুত্ব কিংবা ভালোবাসা অনেক সময় একতরফাও হতে পারে। আমি কাউকে যেভাবে অনুভব করি, সে আমাকে সেভাবে অনুভব নাও করতে পারে। যেমন, নারদকে নিয়ে আমি আজও যেভাবে ভাবি, নারদ হয়তো আমার নামটাও ভুলে গেছে। কে জানে!
যাই হোক, সেটি অন্য বিষয়।
যারা জীবনে কখনো হোস্টেল কিংবা হলে থেকেছে, শুধু তারাই বলতে পারবে সেই জীবনটা কেমন। যারা কখনো হোস্টেলে বা হলে থাকেনি, তারা হয়তো সেই জীবনের অনুভূতিটুকুও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবে না।
হোস্টেল থেকে শেষ বিদায়ের মুহূর্তটি আজও ভুলতে পারি না। বাড়িতে ফিরে এসেও বন্ধুদের কথা মনে করে কতদিন যে কেঁদেছি, তার কোনো হিসাব নেই।
একসঙ্গে থাকতে থাকতে নারদ যে কখন, কোনদিন আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল—সেটা আমি নিজেও বলতে পারব না।
আমাদের সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না। কিন্তু কার বাড়ি কোথায়, সেটা আমরা প্রায় সবাই জানতাম। সেই স্মৃতিটুকুকেই অবলম্বন করে নারদকে আমি বছরের পর বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু আজও তাকে খুঁজে পাইনি।
তবে ফেসবুক আমাকে অনেক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। সেই চিন্তা থেকেই নারদকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া।
“মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই”—বন্ধুত্ব কি এত সহজ?
আমার ওই পোস্টে আমার আরেক কলেজ ও হোস্টেল সহপাঠী শাহেদ মন্তব্য করেছে—
“৪১ বছর পর তুমি শুধু ১ জন নারদকে খুঁজে বেড়াচ্ছ, খোঁজা-খুঁজি বাদ দাও, মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। আল্লাহ তায়ালা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খুঁজতে থাক, ইহকাল ও পরকাল দুটোই পাইবা।”
আমি ওর মন্তব্যের জবাবে জানতে চেয়েছিলাম—“তুই কি বন্ধুত্বের সংজ্ঞা জানিস?”
তবে সত্যি কথা বলতে কী, বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আমি নিজেও জানি না।
কারণ, বন্ধুত্বের যে কোনো সংজ্ঞা নেই।
যেমন সংজ্ঞা নেই মা, বাবা, ভাই কিংবা বোনের সম্পর্কের। পৃথিবীর সবকিছুর সংজ্ঞা খুঁজতে নেই। কিছু কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলোকে কোনো সংজ্ঞা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। বন্ধুত্বও তেমনই একটি সম্পর্ক।
বন্ধুত্বের সঙ্গে ধর্মকর্ম কিংবা আল্লাহ ও রাসুলকে খুঁজে পাওয়ার কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। আল্লাহ তো কোথাও বলেননি—সংসারধর্ম, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধব সব ছেড়ে দিয়ে শুধু তাঁকেই খুঁজতে হবে।
তাহলে তো সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে গভীর জঙ্গলে চলে যেতে হবে! অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে সংসার, সমাজ ও মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করার জন্যই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
আমার বিশ্বাস, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ হলো মানুষকে ভালোবাসা। মানুষের বিপদে-আপদে হাত বাড়িয়ে দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে না পারলেও অন্তত মানসিকভাবে পাশে থাকা—এসবও তো মানবিকতারই অংশ।
আর বন্ধু তো বন্ধু-ই। বন্ধু মানে জানে-জিগর। বন্ধু মানে সুখ-দুঃখের সঙ্গী।
বন্ধু মানে এমন একজন মানুষ, যার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। বন্ধু ছাড়া জীবনের অনেক স্মৃতিই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তিরিশ বছর ধরে মানিব্যাগে রাখা একটি হলুদ স্টিকার
একটা ছোট্ট গল্প বলি। নব্বইয়ের দশকের কথা। তখন আমি যমুনা সেতু প্রকল্পে একটি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করি। সেতু থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে ভূঞাপুর উপজেলা সদরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম।
তখন বয়সও কম। মন ছিল উড়ু উড়ু। কত মানুষের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তাদের মধ্যে একজন ছিল আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইচ্ছে করেই এখানে তার নামটি উল্লেখ করছি না।
প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে। আমরা যে যার মতো অন্য চাকরির সন্ধানে এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছি। সেই সময় আমার ওই বন্ধু একটি হলুদ স্টিকারে তার বাড়ির ঠিকানা লিখে আমাকে দেয়। তখনো মোবাইল ফোনের যোগাযোগব্যবস্থা সেভাবে চালু হয়নি। আমি সেই ঠিকানা লেখা স্টিকারটি অত্যন্ত যত্ন করে আমার মানিব্যাগে রেখে দিয়েছিলাম। গত তিরিশ বছরে কতগুলো মানিব্যাগ যে বদলেছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু বন্ধুর ঠিকানা লেখা সেই ছোট্ট স্টিকারটি কখনো ফেলে দিইনি। সেই ঠিকানার সূত্র ধরে বন্ধুটিকে আমি বছরের পর বছর খুঁজেছি।
অবশেষে, প্রায় তিরিশ বছর পর, একজনের সহযোগিতায় আমি সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুটিকে খুঁজে পেলাম। এরপর মোবাইল ফোনে আমাদের যোগাযোগ শুরু হলো। আমি তিরিশ বছর আগে তার নিজের হাতে লেখা সেই স্টিকারের ছবি তুলে তাকে পাঠালাম। সে ছবিটি তার স্ত্রী ও সন্তানদেরও দেখিয়েছে। তার স্ত্রী নাকি তাকে বলেছিলেন—“এত বছর পরও কেউ এই স্টিকারটা যত্ন করে রেখে দেয়!” সত্যিই, বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। দেখা হয়নি, কথা হয়নি, যোগাযোগ ছিল না—তবুও একটা ছোট্ট স্টিকার বছরের পর বছর ধরে একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে।
দুঃখের বিষয়, অত্যন্ত ব্যস্ততা এবং সময়-সুযোগের সমন্বয় না হওয়ায় তার সঙ্গে তখনো সামনাসামনি দেখা হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন সে আমাকে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে কিছু টাকা চাইল। এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাছে যেকোনো বিষয়ে সহযোগিতা চাইবে—এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বন্ধুত্বে সহযোগিতার প্রশ্ন আসতেই পারে। কিন্তু প্রায় তিরিশ বছর পর, দীর্ঘ একতরফা খোঁজাখুঁজির পর যাকে খুঁজে পেয়েছি, যার সঙ্গে তখনো সামনাসামনি দেখা পর্যন্ত হয়নি—তার কাছ থেকে এভাবে অর্থের প্রয়োজনের কথা শুনে বিষয়টি আমি ভালোভাবে নিতে পারিনি। হয়তো আমার ভাবনাটা ভুলও হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি আমার কাছে ভালো লাগেনি।
এরপর থেকে সেই বন্ধুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কষ্ট পেয়েছি। খুব কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় নিজের অনুভূতির প্রতিও সৎ থাকতে হয়। হারানো বন্ধুকে খুঁজি, কিন্তু বন্ধুত্বের মর্যাদা না দিলে ছেড়ে দিই।
আমি হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের পাগলের মতো খুঁজি। তাদের স্মৃতি আমাকে টানে। পুরোনো দিনের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়—জীবনের কতটা পথ একসঙ্গে হেঁটেছিলাম আমরা! তাই আজও কোনো পুরোনো বন্ধুর সন্ধান পেলে আমি আনন্দিত হই। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে মনে হয়, জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায় যেন আবার ফিরে পেলাম।
কিন্তু একই সঙ্গে একটা কথাও সত্য— বন্ধুত্ব শুধু খুঁজে পাওয়ার নাম নয়; বন্ধুত্বকে সম্মান করারও নাম। যে বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে জানে, তাকে ধরে রাখার জন্য আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করতে পারি। আর যে বন্ধুত্বের মূল্য দিতে জানে না, তাকে ছেড়ে দিতেও আমি এক ফোঁটা দ্বিধা করি না। কারণ, জীবনে অনেক মানুষ আসে, অনেক মানুষ হারিয়ে যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ হারিয়ে যাওয়ার পরও হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায়— স্মৃতিতে, অনুভূতিতে, আর হৃদয়ের একান্ত গোপন জায়গায়। হয়তো নারদও কোথাও আছে। হয়তো আমাকে মনে রেখেছে, হয়তো রাখেনি। তবুও আমি তাকে খুঁজব। কারণ, কিছু মানুষকে খুঁজে পাওয়ার চেয়েও তাদের খুঁজে বেড়ানোর মধ্যেই যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে—সেটাই হয়তো বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক








