অদম্য মানসিক শক্তি, দৃঢ় ইচ্ছা ও অধ্যবসায় থাকলে যে যেকোনো বয়সে সফলতা সম্ভব—তা প্রমাণ করলেন মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা, ৫২ বছর বয়সে এসে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে তিনি সেটিই বুঝিয়ে দিলেন।
কিশোরগঞ্জের রহিমপুরের সন্তান হাবিবুল্লাহ ১৯৯৫-৯৬ সেশনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (কে-৫৩ ব্যাচ) শিক্ষার্থী ছিলেন। যে চিকিৎসা ডিগ্রি ২০০১ খ্রিষ্টাব্দেই শেষ হওয়ার কথা ছিল, দীর্ঘ পথপরিক্রমা পেরিয়ে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে এসে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করলেন তিনি।
হাবিবুল্লাহর বাবা ডা. আবু বকর মোহাম্মদ সিদ্দিক ছিলেন কিশোরগঞ্জের প্রথম এমবিবিএস চিকিৎসক। বাবার বদলির সুবাদে তার শৈশব কেটেছে কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার আর রাঙামাটিতে। শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছিলেন। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে রামানন্দ হাই স্কুল (কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম হয়ে রায় সাহেব মেমোরিয়াল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। পরে ভর্তি হয়েছিলেন নটর ডেম কলেজে। দুর্ভাগ্যবশত আবাসন সংকট, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে তিন মাস পর কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন। গ্রামে ফিরে বাবাকে বললেন, ‘বাবা, আমি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকেই পুনরায় পরীক্ষা দেব।’ সেখান থেকে গড়পড়তা নম্বর নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এই সময়টায় পরীক্ষার মাসখানেক আগে থেকে তীব্র পরীক্ষাভীতি (এক্সাম ফোবিয়া) দেখা দিত হাবিবুল্লাহর। যে কারণে ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া করতে পারতেন না, অসুস্থ হয়ে পড়তেন। প্রায় সব পরীক্ষাই সিকবেডে (অসুস্থ শয্যায়) দিয়েছিলেন।

১৯৯৫-৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান হাবিবুল্লাহ। শুরু থেকেই মনোরোগ বিজ্ঞান বা সাইকিয়াট্রির প্রতি ছিল অগাধ অনুরাগ। সেখানে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এ এস মোহাম্মদ ফিরোজের হাত ধরেই সাইকিয়াট্রিতে হাতেখড়ি হয় তার। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের প্রথম মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পত্রিকা ‘মনোজগত’-এ কাজ শুরু করেন হাবিবুল্লাহ।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকের এক মানবিক উদ্যোগই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন প্রথম প্রফেশনাল এমবিবিএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। একদিন দেখলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোমেন তালুকদার। দৃশ্যটি দেখে অত্যন্ত অসহায় বোধ করেন হাবিবুল্লাহ। চিকিৎসার খরচ নিয়ে স্যারের স্ত্রীও অত্যন্ত বিমর্ষ। হাবিবুল্লাহ ঠিক করলেন, স্যারের জন্য একটা তহবিল গঠন করবেন। একটি দরখাস্ত করে ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্টি, ফার্মাকোলজি ও কমিউনিটি মেডিসিনসহ বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর নিলেন।
এরপর গেলেন মানসিক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজের কাছে। তিনি স্বাক্ষর না করে বললেন, ‘তুমি এই দরখাস্ত ছিঁড়ে ফেলো। বরং আমাকে সদস্যসচিব রেখে কনফারেন্স রুমে একটা মিটিং কল করো।’ তবে ডা. ফিরোজ যেদিন সভা ডাকতে বললেন, সেদিন ছিল পিজি হাসপাতালে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার ডেট। সেটা হাবিবুল্লাহকে জানানো হয়নি। তিনি ঢাকা মেডিক্যালের সব বিভাগের প্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সভার দিন কনফারেন্স রুমে উপস্থিত ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের দুজন শিক্ষক ডা. সোলাইমান তানভীর এবং ব্যাচ কে-৫৪-এর কিছু শিক্ষার্থী। হাবিবুল্লাহ তখন ডা. ফিরোজেকে ফোন করেন। ‘আমি পিজি হাসপাতালে পরীক্ষা নিচ্ছি। তুমি মিটিং ক্যানসেল করে দাও,’ বলে জানালেন ডা. ফিরোজ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক এ এইচ এম মোল্যা তাকে বারবার অকৃতকার্য করান। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার দম্ভ কিভাবে এক মেধাবীকে তিলে তিলে ধ্বংস করতে পারে, হাবিবুল্লাহ তার জীবন্ত উদাহরণ।
পরবর্তী দুই দশক হাবিবুল্লাহর জীবনে এক দীর্ঘ অন্ধকারের কাল। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বাবাকে হারালেন। বছর দুয়েক পরে হারালেন স্ত্রীকেও। ব্যক্তিগত শোক আর শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা তাকে গভীর বিষাদে নিমজ্জিত করে। যে মানুষটি নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিই দীর্ঘ ২০ বছর মনোরোগের সঙ্গে লড়েছেন। এই দীর্ঘ নির্বাসনে টিকে থাকতে কিশোরগঞ্জে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন।
২০২২ খ্রিষ্টাব্দে হাবিবুল্লাহ এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন—যেকোনো মূল্যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবেন। পুনরায় ভর্তি হতে হলে আগের নথিপত্র লাগত। কিন্তু ২৫ বছর আগের নথিপত্র খুঁজে পাওয়া ছিল খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো। ঢাকা মেডিক্যালের সিনিয়র অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম মামুন সেই অসাধ্য সাধন করলেন। তিনি হাবিবুল্লাহর ২৫ বছর আগের পুরনো ফাইল খুঁজে বের করে কাগজপত্র সংগ্রহ করে দেন। এরপর ঢাকা মেডিক্যালের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভা ডাকা হয়। যেখানে ৭৮ জন কাউন্সিল সদস্যের মুখোমুখি হয়ে হাবিবুল্লাহ তার জীবনের সত্যগুলো তুলে ধরেন। তার সততায় মুগ্ধ হয়ে কাউন্সিল তাকে পুনরায় পড়াশোনার অনুমতি দেয়। তবে শর্ত হলো—প্রায় দুই লাখ টাকার মতো জরিমানা দিতে হবে। এক বছর নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করতে হবে। ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর থেকে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত ওয়ার্ড ক্লাস করেছিলেন।
এরপর সার্জারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই পাস করলেন। আবার দুই বছর গ্যাপ। পরে বাকি দুটি পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন করে চূড়ান্তভাবে এমবিবিএস উত্তীর্ণ হলেন। নিজের চেয়ে ২২ বছরের ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে (কে-৭৫ ব্যাচ) ক্লাস করা এবং ওয়ার্ডে কাজ করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। হাবিবুল্লাহ সেই চ্যালেঞ্জে ভালোভাবে জয়ীই শুধু হননি, বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অন্যদের সামনে।
গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি যখন চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাল। তবে হাবিবুল্লাহর একটাই আফসোস—‘সময়মতো পড়াশোনা শেষ না করায় মা অনেক কেঁদেছিলেন। আজ যদি মা-বাবা বেঁচে থাকতেন, দেখতেন তাঁদের ছেলে সত্যিই ডাক্তার হয়েছে!’
কয়েক দিনের মধ্যে এক বছরের ইন্টার্নশিপ শুরু হবে হাবিবুল্লাহর। আগামীতে ডা. হাবিবুল্লাহ সাইকিয়াট্রি নিয়ে করতে চান উচ্চতর গবেষণা।





