ঢাকা | বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,১০ আষাঢ় ১৪৩৩

এমফিল প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েও ডিগ্রি সম্পন্ন করছেন না ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) এমফিল (মাস্টার্স অব ফিলোসফি) কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই সময়মতো তাদের ডিগ্রি শেষ করতে পারছেন না।বিশ্ববিদ্যালয়ের গত আট শিক্ষাবর্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ যথাসময়ে কোর্স সম্পন্ন করতে পেরেছেন। বিপরীতে, প্রায় ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ডিগ্রি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের সময়মতো এমফিল শেষ করতে না পারা বা মাঝপথে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পেছনে মূলত ৫টি কারণ দায়ী।

কারণগুলো হলো- গবেষণার প্রতি একধরনের আগ্রহের ঘাটতি এবং এর মাঝেই চাকরি বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কর্মব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়া, বর্তমান কর্মক্ষেত্রে এমফিল ডিগ্রির সরাসরি বা প্রায়োগিক সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম থাকা, উচ্চতর এই গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত আর্থিক অনুদান বা সহায়তার অভাব, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে গবেষণা গাইডলাইন বা সুপারভিশনে সীমাবদ্ধতা থাকা এবং এমফিল থেকে সরাসরি পিএইচডিতে উন্নীত হওয়ার সুযোগ কমে যাওয়াও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে নিরুৎসাহিত করছে।

উচ্চশিক্ষায় গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এমফিল (মাস্টার্স অব ফিলোসফি), যা মাস্টার্স ও পিএইচডির মধ্যবর্তী গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪-২০১৫ থেকে ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এমফিলে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭ জন। এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সময়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন ৪৭১ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্ধারিত সময়ে এমফিল শেষ করার হার প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা প্রায় ২৭ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে ২৪৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ৭১ জন। ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে এমফিলে ভর্তি হন ৩০৩ জন, এর মধ্যে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি শেষ করেছেন ৫১ জন, ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ১৯৭ জনের মধ্যে ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ৭৩ জন, ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ২১১ জন ভর্তি হলেও ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ৭৮ জন। ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে ২০৬ জন শিক্ষার্থী এমফিলে ভর্তি হন, এর মধ্যে ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ৬৮ জন। আর ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৪ জন। তাদের মধ্যে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ৬৪ জন। তবে প্রতি শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী কতজন শিক্ষার্থী এমফিল ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন, এমন নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট এমফিল শাখা। তারা জানায়, প্রতি সেশনে কত জন ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেছে, সেই তথ্য তাদের কাছে নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, এমফিল প্রোগ্রামের মোট মেয়াদ দুই বছর। এর মধ্যে প্রথম বছর কোর্সওয়ার্ক এবং দ্বিতীয় বছর থিসিস সম্পন্ন করতে হয়। পুনঃভর্তিসহ একজন শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশনের সর্বোচ্চ মেয়াদ থাকে তিন বছর। তবে বিশেষ কারণে নির্ধারিত সময়ে ডিগ্রি শেষ করতে না পারলে, নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে সর্বোচ্চ আরও এক বছর মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে কোর্সওয়ার্ক ও থিসিস জমা দেওয়ার পর মেধাক্রম এবং বিভিন্ন শর্ত ও দিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মাসিক মাত্র ১০ হাজার টাকা হারে এককালীন বার্ষিক বৃত্তি প্রদান করা হয়। এটিকেও নগণ্য বলছেন শিক্ষাবিদরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান তার সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, এমফিলে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। যেমন অনেক শিক্ষার্থী মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ছাত্রত্ব বজায় রাখা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে এমফিলে ভর্তি হন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আর গবেষণায় মনোযোগী হন না। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা চালিয়ে যান না। পড়ালেখার মাঝেই অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করায় শেষ পর্যন্ত আর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেন না। এর পাশাপাশি গবেষণার জন্য যে ভাতা দেওয়া হয় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তদারকির ঘাটতিও এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম বড় কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম এমফিল ডিগ্রি সময়মতো শেষ না হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।সেগুলো হলো- বর্তমান সময়ে ক্যারিয়ার বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এমফিল ডিগ্রির পরবর্তী ব্যবহারিক গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদে গবেষণায় যুক্ত থাকার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। দুই, অনেক শিক্ষার্থী মাস্টার্স শেষ করার পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চাকরি বা ভিন্ন সুযোগ না পেয়ে এমফিলে ভর্তি হন। কিন্তু পরবর্তীতে ভালো কোনো চাকরি বা অন্য পেশাগত ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়ার পর, তারা আর এই গবেষণা শেষ করার সময় বা সুযোগ পান না।

এছাড়া আগে এমফিল থেকে পিএইচডিতে রূপান্তরের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে সেই ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় অনেকের আগ্রহ কমেছে। ছাত্রত্ব, আবাসিক সুবিধা বা রাজনৈতিক কারণে কিছু শিক্ষার্থী এমফিলে ভর্তি হন-এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা থাকতে পারে, তবে এটিকে তিনি এমফিল সম্পন্ন না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম; বরং ডিগ্রিটির সীমিত ব্যবহারিক গুরুত্ব এবং পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যস্ততাই এমফিল শেষ না হওয়ার বড় কারণ বলেও মনে করেন তিনি।