বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড এখন ৫ বছরের সেশনজটে আটকে আছে। অবসরের সুবিধা পাওয়ার আগেই ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ শিক্ষক মারা যাচ্ছেন। আর যাদের পাওয়ার কথা, তারাও সফটওয়্যার জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতায় সময়মতো অর্থ পাচ্ছেন না। শিক্ষকদের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেয়া এই প্রকল্পটি রাজনৈতিক কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থবির হয়ে পড়ে। সরকার পরিবর্তন হলেও পুরোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো আটকে আছে লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন।
যে শিক্ষকরা জীবনের সেরা সময়টুকু ব্যয় করে একটি শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলেন, অবসরে এসে তারাই আজ অনাদর ও অবহেলার শিকার। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা চান, কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই নিজেদের প্রাপ্য অবসর ভাতা হাতে পেতে।
অবসরে যাওয়া এক শিক্ষক এখন প্যারালাইজড। চট্টগ্রামে তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবার। পেনশনের অর্থ পাওয়ার আশায় তার মেয়ে ঘুরছেন অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের বিভিন্ন দফতরে। তিনি বলেন, ‘আমার আব্বু অনেকবার যোগাযোগ করেছেন। আমিও কয়েকবার গিয়েছে; তবু পাইনি।’
ভুক্তভোগী পরিবারের আরেক সদস্য বলেন, ‘ছয় মাস ধরে উনি প্যারালাইজড। হাত-পা সব অবশ। শিক্ষকরা যদি তাদের দুর্দিনে প্রাপ্য টাকা না পান, তাহলে সেটা জাতির জন্য লজ্জার বিষয়।’
গাইবান্ধার একটি স্কুলের নৈশপ্রহরী শফিউল আলমের সংগ্রামও দীর্ঘদিনের। তিনি বলেন, ‘অবসরের টাকার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি। এভাবে দিন চলে যাচ্ছে। মনে হয় টাকাটা আর জীবনে খরচ করে যেতে পারব না। মেয়ের সংসারটাও হয়তো টিকিয়ে রাখতে পারব না।’
একই অবস্থা আবুল কাসেমের পরিবারের। তার বাবা ২০২০ সালে পেনশনের অপেক্ষায় থেকেই মারা যান। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই অর্থ তুলতে বিভিন্ন দফতরে ঘুরছেন তিনি। কাসেম বলেন, ‘আজ ২০২৬ সাল। ছয় বছর ধরে আসা-যাওয়া করছি। তারা যখন যে কাগজ চেয়েছে, সব দিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। বাবা ২০২০ সালেই মারা গেছেন।’
অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তারা বলেন, বারবার বলা হয়েছে টাকা শিগগিরই দেয়া হবে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে সফটওয়্যারের সমস্যা। কবে এই সমস্যা সমাধান হবে, সেটাও কেউ বলতে পারছে না।
আইন অনুযায়ী অবসরের ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম যেন ফাইলবন্দি হয়ে আছে। বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় পাঁচ বছরের সেশনজট তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এখনো ২০২২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে জমা দেয়া আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।
অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রশাসন বিভাগের উপ-পরিচালক অধ্যাপক নাহিদা চৌধুরী বলেন, গেটওয়ের জটিলতার কারণে প্রায় এক বছর আমরা অর্থ পরিশোধ করতে পারিনি। সফটওয়্যার টু সফটওয়্যার সংযোগ ছাড়া আইবাস আমাদের সঙ্গে কাজ করে না। ফেব্রুয়ারিতে যাদের ডাকা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ২৫১ জনের মধ্যে ২০৯ জন জীবিত ছিলেন, আর ৪২ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ প্রায় চার ভাগের এক ভাগ আবেদনকারী মৃত্যুবরণ করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ।
সময় সংবাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জটিলতার প্রধান কারণ তহবিল সংকট। পাশাপাশি স্থায়ী কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রেষণে আসা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দূরত্ব এবং ঊর্ধ্বতন প্রশাসন ও রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অসন্তোষের কারণেও প্রতিষ্ঠানটি কখনো গতিশীল হতে পারেনি।
ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্য সচিব মোশারফ হোসেন লিটন বলেন, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। সবকিছু বুঝে সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট সচিব এবং প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক। শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা দেয়ার এই প্রকল্পটি চালু করেছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ খাতে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
খবর সময় টেলিভিশন





