ঢাকা | শুক্রবার, ১ মে ২০২৬,১৮ বৈশাখ ১৪৩৩

শ্রমিক দিবসেও কুবিতে অবসর মেলেনি যাদের

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই ঝাড়ু হাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসের সড়কে কাজে নেমে পড়েন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন অধিকাংশ শিক্ষার্থী, চারপাশে নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই শুরু হয় তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প।

প্রাণচঞ্চল এই ক্যাম্পাসে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণা, ক্লাস-পরীক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য কর্মচারী। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী ও আবাসিক হলের সাপোর্ট স্টাফদের শ্রমেই সচল থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিন। তবে তাদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশা অনেকটাই আড়ালেই থেকে যায় এমনকি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও।

প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে দিনের দীর্ঘ সময়জুড়ে ক্যাম্পাসের সড়ক, একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হল পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পালন করেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। কিন্তু এই পরিশ্রমের তুলনায় তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ তাদের।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে কাজ করছেন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ জন আনসার সদস্য দিন-রাত ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তর, একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হলজুড়ে কর্মরত রয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের নিরলস পরিশ্রমে সচল থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কার্যক্রম।

এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী বলেন, “আমাদের কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকলেও প্রয়োজনে যেকোনো সময় ডাকা হয়। ড্রেন পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়। কিন্তু বেতন দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে।”

এই নীরব শ্রমের ভিড়েই রয়েছেন মোঃ শাহজাহান (৪০)।আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের শুক্রবারেও তার নেই কোনো ছুটি; দায়িত্বের টানে ঠিকই হাজির হন কর্মস্থলে। প্রতিদিন সকাল থেকে টানা ৮ ঘণ্টা ডিউটি দেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এই মানুষটি মাত্র ছয় মাস আগে এই হলে যোগ দিলেও এর মধ্যেই হয়ে উঠেছেন সবার আপনজন। নিস্তব্ধ হাসিমুখ আর নরম হৃদয়ের জন্য পরিচিত শাহজাহান বন্ধের দিনেও সমানভাবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীরাও তাকে সম্মান দিয়ে সালাম করেন, খোঁজ নেন—এই ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

একই হলের ডাইনিংয়ে কাজ করেন মোঃ রায়হান (১৬)এই বয়সে যেখানে স্বপ্ন দেখার কথা, সেখানে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে সে। নবাব ফয়জুন্নেছা কলেজ থেকে এবছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী রায়হান ডাইনিংয়ের কাজের ফাঁকেই চালিয়ে যাচ্ছে পড়াশোনা। মাস শেষে যে সামান্য বেতন পায়, তা দিয়েই চালাতে হয় তার পরিবারের খরচ। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের কথা সে জানে, কিন্তু তার জীবনে এই দিনের কোনো ছুটি নেই—কাজ থেমে থাকে না। তবুও মুখে থাকে নীরব হাসি। হলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন কাজ করে যায়, আর শিক্ষার্থীরাও তাকে স্নেহে আগলে রাখে, খোঁজখবর নেয় নিয়মিত।

এদিকে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্য মোহাম্মদ ফয়সাল। পরিবারের সন্তানদের নিয়ে স্বল্প বেতনে কষ্টের জীবন পার করছেন তিনি। তবুও দায়িত্বে কোনো গাফিলতি নেই। নীরব কণ্ঠে তিনি জানান, শ্রমিকদের কষ্টগুলো অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়—তাই তারা যেন ন্যায্য মজুরি ও প্রাপ্য মর্যাদা পান, সেটিই তার প্রত্যাশা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা প্রতিদিন ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারি শুধুমাত্র এই শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে। কিন্তু তাদের কষ্টগুলো আমরা খুব কমই উপলব্ধি করি। শ্রমিক দিবসে শুধু শুভেচ্ছা জানালেই হবে না, তাদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে জরুরি।”

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী কর্মচারীরা নির্ধারিত স্কেলে বেতন পেলেও অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সুবিধা পান না। অন্যদিকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক (মাস্টার রোল) কর্মীরা আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন এবং নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

আবাসিক হলগুলোর সাপোর্ট স্টাফরাও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। খাবার পরিবেশন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত থাকলেও তারাও ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসেও কুবির এই শ্রমিক-কর্মচারীদের অবসর নেই, তাদের প্রত্যাশা একটাই: স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং একটি মানবিক কর্মপরিবেশ। নীরবে কাজ করে যাওয়া এই মানুষগুলোর শ্রমেই সচল থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিন; তাই তাদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।