ভাষাশহীদ রফিকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজন নেই। তবে তার গ্রামের বাড়িতে ২৮ অক্টোবর থেকে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছে। রফিকের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ আলম এই অনুষ্ঠানের আয়োজক। আজ ৩০ অক্টোবর বিকেলে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা রফিকের গ্রামের বাড়িতে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জন্মদিনের কেক কাটবেন।
৫২’র ভাষা আন্দোলনে কপালে গুলি লেগে মাথার খুলি চূর্ণ হয়ে গেছে। মগজগুলো অনেকখানি জায়গাজুড়ে বকুল ফুলের মতো থোকায় থোকায় ছড়িয়ে আছে। গুমের উদ্দেশ্যে লাশটা রাখা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অ্যানাটমি হলের পেছনে একটা গোপন কক্ষে। কেউ যেন সেখানে ঢুকতে না পারে, সেজন্য ছিল কঠোর নজরদারি। কিন্তু পুলিশের সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে সেই গোপন কক্ষে ঢুকে ছবি তুলে ফেলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন আলোকচিত্রী আমানুল হক। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে যে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে, তা তৎকালীন সরকার অস্বীকারের চেষ্টা করে। নানাভাবে প্রচার করে, ছাত্রদের ওপর উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুলি চালানো হয়নি। গুলি চালানো হয়েছে প্রতিরক্ষার জন্য। ছাত্র হত্যার ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ওই সময় অস্বীকারের যে বয়ান তৈরি করে, সেই বয়ানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এই একটি মাত্র ছবি। আমানুল হকের তোলা রফিক উদ্দিন আহমেদের মরদেহের সাদাকালো বিমূর্ত ছবিটি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
রফিক বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ। বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র-জনতা যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, তিনি সেই মিছিলে ছিলেন। পুলিশের গুলি তার মাথায় লাগে।
তাতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিহত হন। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ১৭ নম্বর কক্ষের পূর্ব দিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ২৬ বছর বয়সী রফিক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। জন্ম ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে। পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মায়ের নাম রাফিজা খাতুন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রফিক ছিলেন সবার বড়।
পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে সেদিন কেমন করে ভাষাশহীদ রফিকের মরদেহের ছবি তোলা সম্ভব হলো তার বর্ণনা আছে আমানুল হক রচিত ‘একুশের তমসুক’ বইয়ে। মেডিকেল কলেজের বারান্দার সামনের মাঠে প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের সঙ্গে দেখা। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান প্রচার দপ্তরের সহকারী পরিচালক। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেলে ছুটে এসেছিলেন। ইদরিস সাহেব আমানুলকে বললেন, ‘একজন ছাত্রের মাথার খুলি উড়ে গেছে। তার দেহটা হাসপাতালের পেছনের দিকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি কি তার ছবি তুলতে পারবে?’ শুনে আমানুলের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। লাশ লুকিয়ে রাখার তথ্যটি ইদরিস সাহেব পেয়েছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হালিমা খাতুনের কাছ থেকে। পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন হালিমা। ইশারায় তিনজনের কথা হলো। হালিমার পিছু পিছু রওনা হলেন আমানুল। হাসপাতালের পেছনে একটি ঘর। ঘরটি গুদাম ঘরের মতো। সেই ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে একটি লাশ। আমানুল প্রায়ান্ধকারের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ করে জাইস আইকন ক্যামেরার শার্টার চাপেন।
বাসায় গিয়ে হারিকেনের আলোয় নিজের ডার্করুমে কয়েকটি ছবি প্রিন্ট করেন। সন্ধ্যার আগে আগে ইদরিস সাহেব আমানুলের বাসায় যান। তিনি আমানুলের কাছে তিনটি ছবি চেয়ে নেন। এর এক কপি পাঠান দৈনিক আজাদ অফিসে। বাকি দুই কপি পাঠালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মাজেদ খান এবং স্পোর্টস ফেডারেশেনের এএসএম মহসিন সাজুকে। দৈনিক আজাদ এর তখন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে। আবুল কালাম শামসুদ্দীন তখন আজাদের সম্পাদক। তিনি ছবিটা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেন। রাতে ছবিটির ব্লক তৈরি করা হয়। কিছু কপি ছাপার পর পুলিশ এসে পত্রিকাগুলো বাজেয়াপ্ত করে। পরে রাত ২টায় ছবি ছাড়াই আজাদ ছাপা হয়।
আমানুল হক ছাড়াও ওই দিন রফিকের মরদেহের ছবি তোলেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক মীজানুর রহমান। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন ১০ জন করে ছাত্রমিছিল যখন গণপরিষদের দিকে রওনা হয়, তখন এই আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে মীজানুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটের কাছে অবস্থান করছিলেন। তার হাতে বক্স ক্যামেরা। পুলিশের গুলি শুরু হলে ছাত্রমিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রাণভয়ে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি করতে থাকে। পুলিশ যখন ছাত্রবাসে ঢুকে গুলি চালায়, তখন রফিকের পাশেই ছিলেন মীজানুর। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগেই রফিকের মরদেহের ছবিটি তোলেন মীজানুর। তিনি ছবিটি প্রিন্ট করে জমা দেন ইত্তেফাক অফিসে। কিন্তু প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ছবিটি ছাপা সম্ভব হয়নি। পরের বছর একুশের বিশেষ সংখ্যায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ছবিটি প্রকাশ করে। ওই বছর ভাষাশহীদদের স্মরণে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগ যে লিফলেট প্রকাশ করে, তাতে ইত্তেফাকের ছবিটি হুবহু ছাপা হয়।





