সামরিন আইয়ুব যখন প্রথম ভিডিওটি দেখেন, তিনি হতবাক হয়ে যান। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর তার ফোনে স্ক্রল করছিলেন, তখন এক বন্ধু তাকে ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ক্লিপ পাঠায়।
তিনি যখন দিল্লিতে ছিলেন, সে সময়ের গল্প বলা হয়েছে ভিডিওটিতে। টেলিভিশন সংবাদের মতো করে তৈরি ওই ভিডিও ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট।
ভিডিওটিতে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিনের ছাত্রজীবনের বিভিন্ন ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ছবিগুলো ছিল ক্যাম্পাস জীবনের দৈনন্দিন মুহূর্ত থেকে নেওয়া, যার মধ্যে ছিল গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায় অনুষ্ঠান এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেলফি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ভয়েসওভারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দাবি করা হয়, তিনি মুসলিম হলেও হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের শরীর বিক্রি করছেন’। এমনকি তার নিজের ভাইকে তার ‘দালাল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
সামরিন বলেন, ‘ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে, আমার বাবা-মাসহ যে কেউ দেখলে সেটিকে আসল বলেই মনে করত।’
তিনি এমন কয়েকজন মুসলিম নারীদের মধ্যে একজন, যারা একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, যাকে গবেষকরা ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমান একটি ধারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন: যৌনতাপূর্ণ চিত্র ও প্রচারণা তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।
যৌন কল্পনাকে চিত্রে রূপদান
মুসলিম নারীদের ছবি ও ভিডিওকে যৌনতাপূর্ণ করে তোলার এই প্রবণতা নিয়ে গবেষণা চালায় ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট। মে ২০২৩ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত এক হাজার ৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা। তাদের গবেষণায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য: সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে মুসলিম নারীদের যৌন আবেদনময়ী চিত্রায়ণ।
গবেষণাটির সহ-লেখক জেনিথ খান বলেন, ‘জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে দ্রুত এবং বিনা খরচে চিত্রে রূপান্তর করা সম্ভব করেছে। সামান্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়েই বিদ্বেষপূর্ণ বয়ানকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃশ্যমান উপাদানে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়।’
মুম্বাইভিত্তিক রাতি ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি অনলাইন সুরক্ষা হেল্পলাইন, মেরি ট্রাস্টলাইনও এই ধরনের ঘটনার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ্য করেছে। হেল্পলাইনটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে: গণমাধ্যমের মনোযোগ সাধারণত তারকা ও রাজনীতিবিদদের ওপর থাকলেও, জনসমক্ষে না থাকা নারীরাও এমন সব ছবির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও বাস্তব ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টিরও বেশি ঘটনা সামাল দিয়েছে, যার প্রায় ১০ শতাংশই ছিল ডিজিটালভাবে বিকৃত করা বিষয়বস্তু সম্পর্কিত। এআই টুলগুলো আরো সহজলভ্য হওয়ায় এই হার বেড়েই চলেছে।
হেল্পলাইনটির পরামর্শদাতা সালমান মুজাওয়ার বলেন, ‘লজ্জা, ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে এই অপরাধগুলো চাপা পড়ে যায়। ঘটনাগুলো খুব কমই ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রকাশ করা হয়, বৃহত্তর জনপরিসরে আলোচিত হওয়া তো দূরের কথা।’
যৌনতার রাজনৈতিকীকরণ:
সামরিনের ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক সামাজিকমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই আসতে শুরু করে আপত্তিকর মন্তব্য, হুমকি দিয়ে ফোন কল এবং তার চরিত্র নিয়ে নানা অভিযোগ।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল যেন ডিজিটাল গণপিটুনি চলছে। একটি নয়, এক ডজনেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি সব জায়গায় পোস্ট করা হচ্ছিল এবং আরো শত শত অ্যাকাউন্ট তা পুনরায় শেয়ার করছিল।’
সিএসওএইচ সংকলিত ‘ডেটা সেটে’ এআই দিয়ে তৈরি মিম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাকে যৌন উত্তেজক দৃশ্য চিত্রিত করা হয়েছে। এছাড়াও সাংবাদিক ও কর্মীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা মনগড়া অশ্লীল চিত্রও রয়েছে। বেশিরভাগই একজন মুসলিম নারীর সঙ্গে হিন্দু পুরুষের যুগলবন্দী ছবি।
জেনিথ খান বলেন, ‘এই আখ্যানগুলোতে মুসলিম পুরুষদের প্রায়শই সহিংস বা নৈতিকভাবে ভ্রষ্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অন্যদিকে, মুসলিম নারীদের দেখানো হয়-সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরষরা তাদের উদ্ধার করছেন।’
গবেষকরা যুক্তি দিয়েছেন, এই চিত্রকল্প রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় – এটি তারই একটি অংশ।
মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই ঘটনাটিকে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত বৃহত্তর পরিসরে ‘যৌনতার রাজনীতিকীকরণ’-এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ডানপন্থি ডিজিটাল মিডিয়াগুলো নির্যাতনকে স্বাভাবিক করার জন্য হাস্যরস, মিম ও যৌনতাপূর্ণ চিত্রকল্প ব্যবহার করে।
সাহানা বলেন, ‘এই চর্চাগুলো একটি ‘ইকোইজম’ তৈরি করে। এগুলো গোষ্ঠীগত উদযাপন এবং সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর ভর করে টিকে থাকে।’
গবেষকরা বলছেন, এর শিকড় নিছক নারীবিদ্বেষের চেয়েও গভীর আদর্শগত। ‘সাউথ এশিয়া মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাকাডেমিক জার্নাল’-এ গবেষক সোমা বসু যুক্তি দিয়েছেন যে, যা ঘটছে তা হলো যৌনতার রাজনৈতিকীকরণ।
মুসলিম নারীদের শরীর সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে – এই গতিপ্রকৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটেছিল ‘সুল্লি ডিলস’ এবং ‘বুল্লি বাই’ বিতর্কে। এগুলো ছিল ভারতের মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা নকল নিলামের প্ল্যাটফর্ম, যাকে সোমা বসু শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং দলটির ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা উভয়ের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন।
জেনিথ খান বলেন, ‘একজন মুসলিম নারী এবং গবেষক হিসেবে এটি আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার মনে আছে, যখন আমি হিজাব পরা একজন নারীর ছবিকে সফট পর্ন হিসেবে উপস্থাপন হতে দেখেছিলাম, তখন আমি বেশ আতঙ্কিত হয়েছিলাম।’
এই উদ্বেগগুলোর জবাবে বিজেপির রাজনীতিবিদ আতিফ রশিদ বলেন, এআই ‘ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয়ভাবেই ব্যবহার করা যেতে পারে’। রশিদ ডিপফেক এবং যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তুকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করে বলেন, অপরাধীদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে, তিনি বিষয়টিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বিজেপি সকল ধর্মের নারীদের সম্মান করে এবং ‘সুল্লি ডিলস’ ও ‘বুল্লি বাই’ মামলাগুলো আইন মেনেই নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
আরো জোরালো হচ্ছে এই ধারা
২০২১ ও ২০২২ সালে ঘটে যাওয়া সুল্লি ডিলস এবং বুল্লি বাই পর্বগুলোতে বিকৃত ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘সুল্লি ডিলস’ হ্যান্ডেল তৈরির অভিযোগে অভিযুক্ত ওমকারেশ্বর ঠাকুর এবং ‘বুল্লি বাই’-এর নির্মার্তা হিসেবে চিহ্নিত নীরজ বিষ্ণোইকে গ্রেপ্তার করে। দুই মাস পরে, নয়াদিল্লির একটি আদালত ‘মানবিক কারণে’ উভয়কেই জামিন দেয়।
গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআই-এর উত্থান অনলাইনে মুসলিম নারীদের হয়রানির মাত্রা ও গতিকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারকারীদের ছবি আপলোড করার এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন আবেদনময়ী ছবি তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে। এই ধরনের টুলগুলো অনলাইনে প্রায়শই বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং এর জন্য কোনো প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।
যারা ইতোমধ্যেই ক্রমাগত হয়রানির শিকার, তাদের জন্য এআই-নির্মিত ছবির আবির্ভাব ভয়ের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের বিরুদ্ধে কথা বলার পর থেকে অনলাইন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গবেষক ও কর্মী আফরিন ফাতিমা। তিনি সেইসব মুসলিম নারীর মধ্যে একজন, যাদের ছবি সুলি ডিলস-এ আপলোড করে ‘নিলাম’ করা হয়েছিল।
সুলি ডিলস বিতর্কের চার বছর পরেও এই ধরনের হয়রানি কমেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার উপস্থিতি সীমিত হওয়া সত্ত্বেও, বেনামী অ্যাকাউন্টগুলো, প্রায়শই সাধারণ হিন্দু নাম ব্যবহার করে, তাকে আপত্তিকর বার্তা, ধর্ষণের হুমকি এবং হয়রানি করা হচ্ছে।
আই-নির্মিত যৌন উত্তেজক ছবি ভয়কে আরো তীব্র করে তুলেছে। আফরিন বলেন, ‘যখন আমি এই ছবিগুলো সম্পর্কে পড়ি, তখন আমার কাছে বিষয়টি খুব ব্যক্তিগত মনে হয়। এগুলো এক ধরনের ভয়ের মানসিকতা তৈরি করে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখন একা ভ্রমণ করতে অস্বস্তি বোধ করি।’
আমি নিরাপদ বোধ করি না
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামরিনের পেশাগত সুযোগগুলো কমতে শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘একজন মডেল হিসেবে আপনার সুনাম গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার প্রোফাইলে নেতিবাচক মন্তব্য আসে, তাহলে ব্র্যান্ডগুলো আপনার সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়।’
সামরিন নয়াদিল্লির পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে ঘটনাটি জানান। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ দিয়ে কিছুই হয়নি’। বেশিরভাগ আপত্তিকর বিষয়বস্তু কেবল তখনই সরানো হয়েছিল যখন তার বন্ধুরা দলবদ্ধভাবে সেই অ্যাকাউন্টগুলো রিপোর্ট করেছিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতের বিদ্যমান আইনগুলো এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আইনজীবী এবং ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপার গুপ্ত বলেন, ‘ছবিটি মনগড়া হলেও ক্ষতিটা বাস্তব।’
ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ই ধারা অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অঙ্গের ছবি তোলা বা প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু যদি ছবিটি সম্পূর্ণরূপে এআই-সৃষ্ট হয় – তবে এই বিধানটি প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে, লক্ষ্যবস্তু হওয়া মুসলিম নারীদের বিচার পাওয়া অধরাই থেকে যায়।
সামরিন বলেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি যা চেয়েছিলাম তা হলো ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনের মানুষগুলোকে খুঁজে বের করা। তারা আমাকে না চিনেই আমার সুনাম নষ্ট করেছে।’





