বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিভার অভাব নেই—অভাব আছে পরিচর্যার, অভাব আছে সঠিক সময়ে সঠিক সহায়তার। মাঠে ঘাম ঝরানো তরুণ অ্যাথলেটদের গল্প আমাদের চোখে খুব কমই পড়ে, অথচ তাদের অর্জনগুলোই হতে পারে দেশের গর্বের ভিত্তি। এই বাস্তবতার এক জীবন্ত উদাহরণ মোঃ বাকি বিল্লাহ—একজন উদীয়মান অ্যাথলেট, যার সাফল্যের তালিকা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং জাতীয় সম্ভাবনার প্রতিফলন।
জাতীয় পর্যায়ে ২টি স্বর্ণ ও ২টি রৌপ্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২টি রৌপ্য পদক—সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, এগুলো কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। ২০২৫ সালের তারুণ্যের উৎসব আন্তঃ বিভাগ অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ৬.৫৮ মিটার লাফিয়ে লং জাম্পে প্রথম স্থান অর্জন কিংবা বিকেএসপি কাপ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ট্রিপল জাম্প ও লং জাম্পে রৌপ্য জয়—এসব অর্জন একজন অ্যাথলেটের ধারাবাহিক উন্নতির সাক্ষ্য দেয়। একইভাবে, জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি এক দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাফল্যের পেছনে রাষ্ট্র কোথায়?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের অনেক প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ তাদের নিজ নিজ জেলা প্রশাসন কিংবা জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে ন্যূনতম আর্থিক সহায়তাও পান না। আন্তর্জাতিক বা জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করলেও তাদের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় পরিবার—যারা সব সময় এই ব্যয় বহন করতে সক্ষম নয়। ফলে অনেক প্রতিভা মাঝপথেই থেমে যায়, অনেক স্বপ্ন নিভে যায় অন্ধকারে।
একজন অ্যাথলেট যখন দেশের জন্য লড়াই করেন, তখন সেটি শুধু তার ব্যক্তিগত লড়াই নয়—সেটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের ক্রীড়াব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা রয়েছে—তৃণমূল পর্যায়ে সহায়তার অভাব। জেলা প্রশাসন যদি এগিয়ে আসে, যদি তারা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই তরুণরা শুধু নিজেরাই নয়, পুরো দেশকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের প্রয়োজন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। জেলা পর্যায়ে প্রতিভা চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য বিশেষ তহবিল—এসব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নই এখানে মূল বিষয়।
মোঃ বাকি বিল্লাহদের গল্প শুধু একজনের নয়—এটি বাংলাদেশের হাজারো সম্ভাবনাময় তরুণের কণ্ঠস্বর। তারা সুযোগ চায়, ভিক্ষা নয়; তারা স্বীকৃতি চায়, অবহেলা নয়।
আজ যদি আমরা তাদের পাশে না দাঁড়াই, তাহলে আগামীকাল হয়তো আমরা আরেকটি সম্ভাবনা হারানোর গল্প লিখবো। কিন্তু যদি আজই আমরা সচেতন হই, তবে এই তরুণদের হাত ধরেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
সময় এসেছে—প্রশাসন জাগুক, প্রতিভা বাঁচুক।






