ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পুরস্কার পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুবাইয়া মোরশেদ। গত ২৯ এপ্রিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। রুবাইয়া মোরশেদ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশনের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
শিক্ষা গবেষণা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সমতা নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ড. আরিফ নাভিদ এডুকেশন পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশি গবেষক রুবাইয়া মোরশেদ।
সুবিধাবঞ্চিত তরুণ সমাজ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও একাগ্রতার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। ১০০০ পাউন্ড মূল্যমানের এই পুরস্কারের জন্য রুবাইয়া মোরশেদ ছাড়াও চূড়ান্ত তালিকায় আরও তিনজন প্রতিভাবান গবেষক আলী আনসারী, ক্যামিলা হাদি চৌধুরী এবং ইরাম মকবুল স্থান পান।
এই পুরস্কার প্রখ্যাত পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী ও গেটস কেমব্রিজ স্কলার আরিফ নাভিদের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রবর্তন করা হয়েছে। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৪২ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত নাভিদ দারিদ্র্য, অসমতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক গতিশীলতা নিয়ে কাজের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ছিলেন। সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতে তাঁর কাজ ছিল অনন্য। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং তাঁর গুণগ্রাহীরা তাঁর পাণ্ডিত্য ও উদার চিন্তাধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে এই পুরস্কার চালু করেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে জানানো হয়, রুবাইয়া মোরশেদের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শিক্ষাব্যবস্থাকে সুবিধাবঞ্চিত এবং স্কুলছুট শিশুদের জন্য আরও কার্যকর করার উপায়। তিনি কেবল একাডেমিক গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখে শিক্ষা সংস্কারে জনমত তৈরিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তাঁর গবেষণাপত্রগুলো সুপরিচিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
রুবাইয়া মোরশেদ শিক্ষা ও অর্থনীতির আন্তসম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করে আসছেন, বিশেষ করে শিক্ষার অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ফল বিশ্লেষণে। তাঁর গবেষণায় দেখা হয় শিক্ষা কীভাবে আয়, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামগ্রিক মানবসম্পদ গঠনে ভূমিকা রাখে, পাশাপাশি কীভাবে এটি সামাজিক ফল যেমন ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া তিনি নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীদের ভোটদানে অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং পারিবারিক প্রেক্ষাপট কীভাবে তাঁদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা ও অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে। প্রমাণভিত্তিক এই গবেষণাগুলো নীতি প্রণয়ন ও উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
এ ছাড়া রুবাইয়া মোরশেদ ইউনিসেফের শিক্ষা গবেষণা পরামর্শক হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত ও স্কুলছুট শিশুদের জন্য প্রাথমিক ও বৃত্তিমূলক কর্মসূচির ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্টগুলোতে অবদান রেখেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘নোবডিস চিলড্রেন’–এ তিনি সেসব শিশুর কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন, যারা কখনোই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।
রুবাইয়া মোরশেদ গণমাধ্যমে বলেন, এই স্বীকৃতি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচারের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আরিফ নাভিদের আদর্শকে ধারণ করে আমি সব সময় কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা করব এবং দয়া ও মহানুভবতাকে পাথেয় করে এগিয়ে যাব।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক কামাল মুনির বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। রুবাইয়া মোরশেদের পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার অধ্যাপক রিকার্ডো সাবাতেস। অনুষ্ঠানে আরিফ নাভিদের স্ত্রী সানা ও তাঁদের শিশুকন্যা আলিয়ানাহ উপস্থিত ছিলেন।
নাভিদের পিএইচডি সুপারভাইজার অধ্যাপক মেডেলিন আরনট বলেন, রুবাইয়ার গবেষণা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গতিশীলতা অর্জনের পথে একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করছে। আরিফের মতোই তিনি কাঠামোগত অসমতা ও শিক্ষাগত সংস্কার নিয়ে কাজ করেন। এই পুরস্কারটি তাঁর ক্যারিয়ারের অর্জন এবং মিশনের প্রতি একটি যোগ্য সম্মান।





