ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকা কলেজে বর্জ্য অপসারণে উদাসীনতা, বাড়ছে ডেঙ্গু  ঝুঁকি

কয়েক দিন আগেও স্বাভাবিকভাবেই চলছিল ঢাকা কলেজের উত্তর হলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান নোমানের জীবন। হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ জ্বর ভেবে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শরীরের তাপমাত্রা। দেখা দেয় তীব্র দুর্বলতা, শরীরব্যথা ও নানা ধরনের শারীরিক অস্বস্তি।অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় একপর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন নোমান। তার শারীরিক উপসর্গ বিবেচনায় চিকিৎসক ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পরীক্ষা শেষে রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন  তিনি। 

নোমানের মতো দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রবিউল হাসান সাগর ও হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবে গুরুত্ব না দিলেও সময়ের সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পজিটিভ আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শুধু নোমান বা সাগরই নন, গেল মাসে কলেজের প্রায় অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ও জলাবদ্ধতার কারণে বেড়েই চলছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। ক্যাম্পাসের একাধিক স্থানে বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৯২ হাজার ২১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৮৯ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৮৬০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আটজন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি ও পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং নিয়মিত এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও সমন্বিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা কলেজ যেন অঘোষিত ডাস্টবিন 

ক্যাম্পাসের একাধিক স্থানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য এবং সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা কলেজের টেনিস গ্রাউন্ড, পুকুরপাড়, দক্ষিণ হলের সামনে, হল মাঠের বিভিন্ন অংশ, উত্তর হলের পেছনে, আন্তর্জাতিক ও পশ্চিম হলের সামনে, ইলিয়াস হল ও দক্ষিণায়ন হলের সামনের অংশ এবং ফরহাদ হলের পেছনে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কোথাও বর্জ্য খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের ময়লা এক জায়গায় জমে থাকতে দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দীর্ঘ দিন হতে কলেজ থেকে ময়লা অপসারণ করা হয়না।আবার কিছু কিছু  ময়লার স্তুপে মাঝে মাঝে দেয়া হয় আগুন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ

ঢাকা কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ময়লা পড়ে থাকায় সামান্য  বৃষ্টিতে পানি জমে মশার উপদ্রব আরও বাড়ে। ফলে ক্লাস, হল ও ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

মাহাদী নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, হল পাড়ার বিভিন্ন জায়গায় ময়লা জমে থাকায় মশার উপদ্রব বাড়ছে। কয়েক দিন আগে আমার পাশের রুমের একজনের ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছে।    

মনিরুল নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাস এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার কথা কিন্তু আমাদের ক্যাম্পাস বিশেষ করে হল পাড়া এলাকা বেশি অপরিষ্কার। বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তুপ হয়ে আছে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কারও করা হচ্ছে না ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্যাম্পাস নিয়মিত পরিষ্কার এবং বিভিন্ন জায়গায় ডাস্টবিন স্থাপন করা দরকার

ময়লার স্তূপ অপসারণে সিটি করপোরেশনের উদাসিনতা 

ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ও মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

চিকিৎসকের দৃষ্টিতে ঝুঁকি

ঢাকা কলেজের মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. এ বি এম আল আমিন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে সংক্রমণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীরা সচেতন হলে তা আরও কমানো সম্ভব। ক্যাম্পাসের আশপাশের জমে থাকা পানি ডেঙ্গু মশার প্রজননের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও পরিচ্ছন্নতায় সক্রিয় হতে হবে।

তিনি আরো  বলেন, জ্বর হলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা ও রক্তপাত ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত। আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত তরল পান, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত মশারি ব্যবহার করা জরুরি। 

আক্রান্ত ব্যক্তিকেও মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু একবার হলে দ্বিতীয়বার হলে সংকট আরও বাড়ে এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরও মশারি ব্যবহার করা জরুরি, যাতে অন্য কোনো মশা তাঁকে কামড়িয়ে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে না দেয়।ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান উপায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

ঢাকা কলেজ প্রশাসন ভাষ্য

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস   বলেন, শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। সিটি কর্পোরেশনকে চুক্তি অনুযায়ী মাসিক ৮,০০০ টাকা ও অন্যান্য ফি দেওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে নিয়মিত ময়লা অপসারণ করা হচ্ছে না। ময়লা অপসারণে সিটি কর্পোরেশনকে প্রতিনিয়ত চিঠি দেওয়া  হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নিয়মিত ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখার বিষয়েও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমানো ময়লার স্তূপ দ্রুত অপসারণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ও বড় ট্রাক এনে একদিনে সব বজ্য অপসারণ করা হবে।

ক্যাম্পাসে ময়লার স্তুপে আগুন দেয়া হয় এ বিষয়ে তিনি বলেন,ময়লার স্তুপে আগুন দেয়া সম্পুর্ন  নিষেধ করা আছে যদি কেউ দেয় তবে  ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়াও তিনি  শিক্ষার্থীদের যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নিজস্ব রুম ও চারপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১ এর সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা কলেজ থেকে ময়লা আমরা নেই কি না, এটা আমার পিসিএসপি-কে জিজ্ঞেস করতে হবে। প্রতিটা ওয়ার্ডে আমাদের একজন ঠিকাদার নিযুক্ত আছে তারা চুক্তি ভিত্তিক কাজ করে। আমাকে আগে জানতে হবে সে ঢাকা কলেজের সাথে কোনো তার চুক্তি আছে কি না। যদি থাকে থাকে তাহলে সে তো অবশ্যই নিয়মিত নিবে। আর যদি নিয়মিত তার চুক্তি না থাকে, তাহলে ঢাকা কলেজকেই আমাদের এসটিএস-এ পৌঁছায় দিতে হবে।”

কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে ঢাকা কলেজ থেকে বর্জ্য অপসারণের চুক্তি এ প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আপনার কাছ থেকে তথ্যটা পেয়ে আমার উপকার হলো। আমি এখনই ঠিকাদারকে জিজ্ঞেস করব। আজই সে যাবে, কেন সে যাচ্ছিল না, সেটি ব্যাখ্যা করে স্যারকে জানাবে। প্রয়োজনে আমি ঢাকা কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।”

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান

ঢাকা কলেজে কি কারণে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে না এ বিষয়ে বজ্য অপসারণের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঠিকাদার রুহুল আমিন সাথে বার বার  যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি ।